গাজীপুর

ভ্রমণে অন্যরকম একদিন

প্রকাশ : 31 জানুয়ারি 2011, সোমবার, সময় : 09:04, পঠিত 4905 বার

রণক ইকরাম
আয়োজনটা গোছানো হওয়ার কথা। কিন্তু গোছানো আয়োজনে আমার প্রবেশটা হুট করেই। গাজীপুর ভ্রমণে যাওয়া হবে। সঙ্গী আমারই মতো একদল সাংবাদিক। উদ্দেশ্য সামান্য ঘোরঘুরি। প্রেস ক্লাব আর কারওয়ান বাজার দুই জায়গা থেকেই গাড়ি ছাড়বে। আমার সুবিধা প্রেস ক্লাব। বেশ আয়োজন করে সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম। এতদিন পর্যন্ত ঢাকায় শীতের আমেজটা টের পাইনি। ওইদিন হাড়ে হাড়ে বুঝেছি, ঢাকায়ও শীত আছে তাহলে! প্রেস ক্লাবের সামনে পৌঁছাতেই আয়োজক সিরাজুল ভাইয়ের ফোন রণক পৌঁছেছেন? আমি বীরদর্পে বললাম জি স্যার! একেবারে ঠিক সময়ে। সিরাজুল ভাইয়ের ইন্সট্রাকশন মতো ভ্রমণযন্ত্র মাইক্রোবাসটা খুঁজে নিতে খুব একটা কষ্ট হল না। ভেতরে অপেক্ষমাণ নয়া দিগন্তের সোহেল অটল, অন্যদিনের মোমিন ভাই আর বিচিত্রার হাফিজ ভাই। গাড়ি ছাড়ার কথা সাড়ে আটটায়। নয়টা বেজে গেলেও গাড়ি ছাড়ার কোন নাম নেই। অবশেষে আরও দুজন যোগ দিলেন আমাদের সঙ্গে। যোগ দিলেন, এ রুটের সর্বশেষ যাত্রী অলওয়েজ লেট লতিফ, ইশতিয়াক ভাইও। জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটল শেষ পর্যন্ত্র ভ্রমণযন্ত্র ধোঁয়া ছেড়ে রওনা করল কাক্সিক্ষত গন্তব্যে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি থেমে গেল। তখনও ভ্রমণের আনন্দে গা গরম হয়নি। এত জলদি গাড়ি থামল কেন? জানা গেল, কারওয়ান বাজারের গাড়িটাসহ একসঙ্গে রওনা করবে। বুঝলাম অনির্ধারিত যাত্রাবিরতির খপ্পরে পড়েছি। সুযোগ বুঝে আমি, ইশতিয়াক ভাই আর অটল ভাই মিলে পাশের হোটেলে নাশতা সেরে নিলাম। আবারও সিরাজুল ভাইয়ের ফোন। তখনও মূল আয়োজকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। ফিরে এসেই দেখি আমাদের গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে! গাড়ি বদল করে আমরা পরেরটায় ওঠে পড়লাম। আমাদের তিনজনের পাশাপাশি সঙ্গী আয়োজক সিরাজুল ভাই, হাফিজ ভাই, সানভীসহ আরও দুজন। আবারও চলতে শুরু করল গাড়ি। বলা চলে মূল যাত্রা শুরু হল। ঢাকার রাস্তার ভয়াবহ শব্দ দূষণ আর ব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে শুরু করেছে সূর্যের তাপ। সেই সঙ্গে গাড়ির ভেতর চলা নানান জোকসের উপস্থাপনা শীতকে কোথায় ঠেলে দিয়েছে কে জানে। হাসি-ঠাট্টা আর গল্পে গল্পে চলে গেল অনেকটা পথ। একসময় গাড়ি ঢুকল আশুলিয়ার দিকে। ঢাকার ব্যস্ততা তখনও লাগেনি আশুলিয়ার সবুজ বদনে। কেমন যেন ছিমছাম ভাব। হঠাৎ সাঁই করে ছুটে চলা দ্রুতগামী বাসে চমকে উঠতে হয় বারবার। সেই চমকের ঘোর কাটতে না কাটতেই দুপাশের সবুজের ভুবনে ডুবে যায় মন।  দিগন্তবিস্তৃত ফসলের ক্ষেত যেন অনিশ্চিত ভুবন পর্যন্ত সুবিস্তৃত। এর মাঝখানে চলল নাটকীয়তা। আমরা তখন আশুলিয়া পেরিয়ে গন্তব্যের খুব কাছাকাছি। কিন্তু আমাদের পথনির্দেশক সিরাজুল ভাইও কখনও যাননি সেখানে। আর তাই সেলফোন আর স্থানীয় মানুষের ভরসায় আঁকাবাঁকা ভাঙা সড়কজুড়ে চলতে থাকল গাড়ি। ততক্ষণে লালমাটির গন্ধ নাকে এসে লেগেছে। চারপাশে শালের অরণ্যে দুলে উঠল মন। যেন মনে হচ্ছে পাহাড়ি কোন বনের মাঝখান দিয়ে চলে আমাদের ভ্রমণ গাড়ি। অবশেষে গন্তব্য এসে গেল। রাঙামাটি ওয়াটারফোর্ট। ভালোই তো ঢাকায় রাঙামাটি! ভ্রমণের ক্লান্তি আর পেটের ক্ষুধা নিয়েই গাড়ি থেকে নামলাম সবাই।
এর মধ্যেই একত্রে পেয়ে গেলাম যায়যায়দিনের রীতা আপা, কালের কণ্ঠের রাব্বানী ভাই ও তার স্ত্রী এবং নিউএজের খালেদসহ অন্যরা। পরবর্তী করণীয় চিন্তা করার আগেই কে যেন ক্ষুধা দেবতার জন্য বর প্রার্থনা করল। সমর্থনও মিলল খুব দ্রুত। এরপর চিতই পিঠা আর ভর্তা, বিস্কুট, চা যোগে চলল নাশতা। অবশ্য এ পর্বের আগেই রিসোর্টের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা মিলেছে। এরপর ঘুরে বেড়ানোর পালা। প্রায় ১০০ একর আয়তনের এটি তৈরিতে কৃত্রিমতার চেয়ে প্রাকৃতিক রূপটাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যেন দূর অরণ্যের এলোমেলো কোন জায়গার মাঝখানে এক চিলতে গোছানো জগৎ। সুন্দরের নেশায় নিমিষেই ক্লান্তি মুছে গেল। দেখার ফাঁকে সানভী আর খালেদ বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে নোট নিচ্ছিল। চারপাশে ফুল গাছের ছড়াছড়ি। যেন অরণ্য আর ফুল বাগানের অদ্ভূত সহাবস্থান। আঁকাবাঁকা পায়ে হাঁটা রাস্তার দুপাশে নানা রকম ফুল গাছ। গোলাপ, গাঁদা কিংবা গ্লাডিওলাস ফুলগুলোর ঔদ্ধত্য চাউনি বুঝিয়ে দিচ্ছে শীতের সূর্যকে এরা থোড়াই কেয়ার করে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এখানে নানা আদলে তৈরি বেশকিছু কটেজ। এর মধ্যে কোনটা একেবারে আধুনিকতায় ভাস্বর আবার কোনটা একেবারে গ্রামীণ আদলে ছনে ছাওয়া। আছে  কৃত্রিম জলাশয়, পাতকুয়া। আবার জলাশয়ের মাঝে মাঝে ছনের ছাউনি দেয়া ঘর। কোথাও আবার কাঠের পাটাতনের পুল। নামগুলোও বেশ নান্দনিক। যেমন একটার নাম জলসা ঘর। এর ফাঁকে ফাঁকেই চলল ফটোসেশন আর হৈ-হুল্লোড়। এর মধ্যেই হঠাৎ রিসোর্টের মাঝখানের বিশাল মাঠ দেখে ক্রিকেট খেলার খায়েশ জাগল। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেই তো হবে না! রসদও থাকতে হবে। ক্ষণিকের মধ্যেই মিলে গেল রসদ। ব্যাট, বল, স্ট্যাম্প সবই। আমরা ৫ জন ৫ জন ১০ জন দুদলে ভাগ হয়ে গেলাম। রীতা আপা আর রাব্বানী ভাইয়ের স্ত্রী দায়িত্ব নিলেন স্কোরারের। বাংলা মাটি আর রাঙামাটি দুদলে ভাগ হয়ে শুরু হল ম্যাচ। ম্যাচে বিশাল ব্যবধানে জিতলাম আমরা মানে বাংলা মাটি। সবার আগ্রহে ম্যাচ শুরু হল আরেকটা। এবার রাঙামাটির জয়জয়কার। আমরা হেরে গেলাম। ততক্ষণে বিকাল নেমে এসেছে। ক্ষিধেয় পেট চো-চো করছে। সবাই পাত-তাড়ি গুটিয়ে ফ্রেশ হয়ে চলে এলাম খাবার ঘরে। বেশ ভালো আয়োজনে পেটপুরে খেল সবাই। এর মধ্যেই রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ এসে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেলেন। রওনা দিতে দিতে প্রায় সন্ধ্যা নেমে এল। ততক্ষণে একটা হঠাৎ ভ্রমণের ক্লান্তিতে অবসন্ন সবাই। আর এর মধ্যে আবার ক্রিকেট। এ ক্রিকেট সবাইকে যেমন চরম আনন্দ দিয়েছে, তেমনি সবারই শরীর একেবারে ভেঙে আসছিল।
তখন সবারই এক চিন্তা কখন পৌঁছাব ঢাকায়! ভয়ানক জ্যাম ঠেলে অবশেষে ফেরা হল। রাস্তায় একে একে কমতে থাকল ভ্রমণসঙ্গী। আমিও কারওয়ান বাজার নেমে পা বাড়ালাম বাসার উদ্দেশে। সত্যি সবুজ, রাঙামাটি, আর সঙ্গীদের সঙ্গে একেবারে অন্যরকম একটা দিন কাটল। কাল সকালেই আবার অফিস!! 

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology