জামালপুর

পাহাড় আর অরণ্যের মাঝে সূর্য উৎসব

প্রকাশ : 02 মার্চ 2011, বুধবার, সময় : 09:19, পঠিত 3645 বার

গাজী মুনছুর আজিজ
চারপাশেই পাহাড় আর বন। বনের মাঝখানেই ছোট্ট খাল। খালের পাড়ে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, বুড়া-যুবা দাঁড়িয়ে। তাদের সবার হাতেই মঙ্গল প্রদীপ। আর সময়টা শীতকালের মধ্যরাত। লোকালয়ের মানুষ তখন গভীর ঘুমে। কিন্তু খালের পাড়ে মঙ্গল প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে ঘুম নেই। তারা সবাই অপেক্ষা করছে নতুন বছরের নতুন দিনের। তাই ঘড়ির কাঁটার দিকে সবার নজর। অতঃপর ঘড়ির কাঁটা ১২টা পেরিয়ে পা রাখে নতুন বছরের নতুন দিনে। ঠিক তখনই তারা শুভ দিনের প্রত্যাশায় মঙ্গল প্রদীপ ভাসিয়ে দেয় খালের পানিতে। তার সঙ্গে সঙ্গেই জ্বলে ওঠে নতুন দিনের আলোকবাতি। আর এভাবেই তারা বরণ করে নেয় নতুন বছরকে।
২০১১ সালকে বরণ করে নেয়ার এমন আয়োজনই হয়েছিল পাহাড় আর অরণ্যে ঘেরা জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জের লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্রে। সূর্য উৎসব নামে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা করে ইনসাইটা ট্যুরিজম।
৩০ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকার শাহবাগের ছবির হাট থেকে শুরু হয় সূর্য উৎসবের যাত্রা। দুটি বাসে মোট ৫১ জন সদস্য নিয়ে বাস এগিয়ে চলে। পথে বাস বিরতি দেয় ময়মনসিংহের চুরখাই। সেখানে চা-নাশতা খেয়ে আবার চলে বাস। ৩১ ডিসেম্বর সকাল ৭টার দিকে বাস এসে থামে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জের লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্রে। বাস থেকে নেমে লাউচাপড়ার সৌন্দর্য দেখে সবাই এক বাক্যেই বলে উঠল, বাহ চমৎকার জায়গা।
দলনেতা মিলন ভাই সবাইকে যার যার রুম দেখিয়ে দিলেন। রুমে উঠে নিজের জায়গা বুঝে নিয়ে হাত-মুখ দুয়ে আবার সবাই এক হই নাশতা খাওয়ার জন্য। নাশতা হিসেবে গরম গরম খিচুড়ি। শীতের সকালে এ খিচুড়ি বেশ ভালোই লাগল। তারপর খানিক বিশ্রাম। আবার সবাই এক হলাম। তারপর সবাই সবার পরিচিতি দিলাম। পরিচিতি শেষে মিলন ভাই জানিয়ে দিলেন উৎসবের বিভিন্ন আয়োজনের কথা। তারপর শুরু হল আমাদের এলাকা পরিদর্শন।
লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্র ঘুরে আমরা এর আশপাশের লোকালয়, এখানকার গারো সম্প্রদায়ের পাড়া, খিস্ট্রিয়ান মিশনারি স্কুলসহ বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়িয়ে আবার হাজির হলাম আমাদের থাকার জায়গায়। খানিক বিশ্রাম নিয়ে এলাম দুপুরের খাবার খেতে। খাবার খেয়ে যে যার মতো ঘুরতে বের হলাম। কেউ কেউ বিশ্রাম নিতে রুমে গেলেন।
সবাই সবার মতো থাকলেও আয়োজকরা ব্যস্ত ছিলেন সূর্য উৎসবের নানা প্রস্তুতি নিয়ে। আয়োজনের অংশ হিসেবে লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্রের ক্ষণিকা অবসর বিনোদন কেন্দ্রের পাহাড়িকা ডাকবাংলো সাজানো হয় নানা রঙের কাপড় ও কাগজ দিয়ে। এছাড়া ডাকবাংলো সাজানোর পাশাপাশি কেউ কেউ ব্যস্ত ছিল সূর্য উৎসবের নমুনা সূর্য ও মঙ্গল প্রদ্বীপ তৈরিতে।
সন্ধ্যার ঠিক আগে সবাই হাজির হই এখানকার ওয়াচ টাওয়ারে। সমতল থেকে ১৫০ ফুট পাহাড়ের ওপর নির্মিত ৬০ ফুট উঁচু এ টাওয়ার থেকে আমরা বছরের শেষ সূর্যাস্ত দেখব। কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকার কারণে সূর্যাস্ত দেখা গেল না।
সন্ধ্যার পর আমাদের টেলিস্কোপে আকাশ পর্যবেক্ষণ করার কথা। কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকার কারণে আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে দেরি হয়। বেশ খানিক পর আকাশ পরিষ্কার হয়। তারপর শুরু হয় আমাদের আকাশ পর্যবেক্ষণ। বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাস্ট্রোনমি বিভাগের প্রধান জিকরুল আহসান টেলিস্কোপে আমাদের সবাইকে আকাশের বৃহস্পতি গ্রহ দেখান।
আমরা ছাড়াও আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে স্থানীয় অধিবাসীরাও আসেন। তারা টেলিস্কোপে আকাশে বৃহস্পতি গ্রহ দেখে বেশ আনন্দই পেয়েছে।
পর্যবেক্ষণ শেষে রাতের খাবার খাই। তারপর অপেক্ষা করতে থাকি কখন রাত ১২টা বাজবে। আমরা সবাই মঙ্গল প্রদীপ হাতে নিয়ে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকি।
অতপর ১২টা বেজে ঘড়ির কাঁটা নতুন বছরে পা রাখে। সেই সঙ্গে আমরা খালে ভাসিয়ে দেই মঙ্গল প্রদীপ। তারপর খালের ওপর নির্মিত বৈঠকখানায় আসি। এটিও সাজানো হয়েছে প্রদীপ দিয়ে। এখানে আমরা আতশবাতি জ্বালিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাই। সত্যিই নির্জন এ বনে শীতের রাতে আলো জ্বালিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার এই আয়োজন বেশ ভালোই লেগেছে। বরণ শেষ করে গরম গরম পরাটা আর খাসির মাংস খেয়ে রুমে আসি ঘুমাতে।
লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্রে যে কয়টি থাকার কটেজ বা রুম রয়েছে, তার মধ্যে আমাদের রুমটি পাহাড়ের অনেক উঁচুতে এবং অনেক দূরে ও নির্জনে। তাই ঘুমানোর সময় একটু ভয় করছিল। আমাদের এই রুমে আমিসহ উৎসবের সহযাত্রী সোহেল, শরীফ ও শাকিল ফারুক চারজন থাকার কথা। সারাদিন আমরা চারজন ছিলামও এক সঙ্গে। এছাড়া সারাদিনের ঘোরাঘুরির সময় আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় চট্টগ্রামের সহযাত্রী চিত্রশিল্পী আবেশ কুমার ইন্দু অপুর সঙ্গে। তাই ঘুমানোর সময় আমরা তাকেও আমাদের সঙ্গে নিলাম। রাতে শিয়ালের ডাক শুনতে শুনতে ঘুমাই। দীর্ঘদিন পরে শিয়ালের ডাক শুনতে পেলাম এ বনে এসে।
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমরা সবাই আবার হাজির হই ওয়াচ টাওয়ারে নুতন বছরের প্রথম সূর্যোদয় দেখার জন্য। সবাই মাথায় নমুনা সূর্য পরে অপেক্ষায় থাকি নতুন বছরের সূর্য দেখার জন্য। কিন্তু সূর্য ওঠার সময় পার হয়ে গেল অথচ আমরা সূর্য দেখতে পেলাম না। কারণ আকাশ ছিল মেঘলা, তাই সূর্য ওঠা দেখা যায়নি। অবশ্য বেশ খানিক পরে সূর্য আকাশে উঁকি দিয়েছে। ততক্ষণে আমরা টাওয়ার থেকে নেমে নিচে চলে আসি। নতুন বছর উপলক্ষে আমরা একজন অন্যজনের হাতে রাখি পরিয়ে দেই।
উৎসবের ব্যবস্থাপক মাসুদুল হাসান জায়েদী বলেন, প্রতি বছর আমরা মাথায় পরার নমুনা সূর্যটা তৈরি করি হলুদের ওপর লাল রঙ দিয়ে। কিন্তু এবার আমরা এটা তৈরি করেছি সবুজের ওপর লাল রঙ দিয়ে, কারণ এর মাধ্যমে আমরা জানাতে চেয়েছি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য আগামীতে সবুজ পৃথিবীর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে।
টাওয়ার থেকে আমরা আবার খালপাড়ে আসি। এবার আমরা খালের পানিতে নানা রঙের বেলুন ফুলিয়ে ভাসিয়ে দেই। তারপর খেয়ে নেই সকালের নাশতা। নাশতা খাওয়ার কিছুক্ষণ পর শুরু হয় উৎসবে আসা অভিযাত্রীদের মধ্যে মজার মজার খেলা প্রতিযোগিতা। সবাই বেশ উপভোগ করেছিল এই খেলা।
তারপর সবাই মিলে গ্রপ ছবি তুলে দুপুরের খাবার খেয়ে বাসে উঠি ফেরার জন্য। ফিরতি পথেও বাস বিরতি দেয় চুরখাই। রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাস এসে থামে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে। পরস্পরকে বিদায় দিয়ে বাসায় ফিরি।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology