শেরপুর

সবুজে দিই ডুবসাঁতার

প্রকাশ : 21 আগস্ট 2010, শনিবার, সময় : 09:57, পঠিত 3384 বার

সুদীপ্ত সালাম
রাত বাড়ার সাথে সাথে বাসের গতিও কমে আসে, তারওপর ছিল বেশ কয়েক জায়গায় তীব্র জ্যাম। রাত তখন সাড়ে ১২টা, বাস থেকে শেরপুর বাসস্ট্যান্ডে নামলাম আমি ও রিপোর্টার অপূর্ণ। এখান থেকে যেতে হবে নালিতাবাড়ি। কিভাবে যেতে হবে এখনও পর্যন্ত জানি না। এখন শুধু জানি পেটপূজা জরুরি। দোকানপাট অধিকাংশই বন্ধ হয়ে গেছে। বাঁশের বেড়ায় ঘেরা একটি হোটেলে ঢুকে পড়লাম। হাতমুখ ধুতে ধুতে জানলাম, আছে কেবল ভাত, ডিমভাজা, সন্ধ্যার পরোটা আর এক পিস মাছ। আমি নিলাম রাবার টাইপ পরোটা ও ডিমভাজা, অপূর্ণ নিল ভাত ও মাছ। ওর থালায় সাদা ভাতের চেয়ে কালো কালো মরা ভাতের প্রকোপ দেখে আমি ভাত খেতে সাহস করিনি। খাওয়া শেষে রওনা হলাম নালিতাবাড়ির উদ্দেশ্যে। জানা গেল, নালিতাবাড়ি বাজার যেতে এই মধ্যরাতে একমাত্র যান মোটরসাইকেল। অনেক দেনদরবার শেষে আমরা দুজন উঠে বসলাম একটি প্রায় নতুন বাজাজ পালসারের পেছনে, ভাড়া জনপ্রতি ৫০ টাকা। অন্ধকার চিড়ে ৮০ কিলোমিটার বেগে পালসার ছুটলো। মাথার ওপরে উদার স্থির রহস্যময় আকাশ, দুপাশে ঘরবাড়ি-গাছপালার চলমান সিল্যুট। কানে বাতাসের বিরতিহীন আর্তনাদ। চালককে জিজ্ঞাসা করলাম, কতক্ষণ লাগবে যেতে? তৎক্ষণাৎ উত্তর, ১৫ মিনিট। চালকের মুখ থেকে শুধু প্রশ্নের উত্তরই পেলাম না, দুর্গন্ধও পেলাম। সন্দেহ নিয়ে চালককে প্রশ্নটা করেই বসলাম, ভাইয়ে কি খাইছেন নাকি? বোকার মতো হেসে বদমাইশটা প্রমিত বাংলায় উত্তর দিল, বেশি খাইনি ভাই...একটু না খেলে মাথা ঠিক রাখা যায় না। আমার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। ওকে থামানোরও কোনো উপায় নেই। আামার পেছনে বসা রিপোর্টারকে আর এই বয়াবহ খবরটা পাস করলাম না। বাকি রাস্তাটা প্রায় চোখ বন্ধ করেই কাটালাম। রাত ১টার দিকে নালিতাবাড়ি পৌছালাম। মোটরসাইকেলওয়ালাকে বিদায় দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। কিন্তু স্বীকার করতে হলো লোকটা ওই খাওয়া অবস্থায়ও নিখুঁত চালিয়েছে।
সাংবাদিক হীরা (বাংলা ভিশনের শেরপুর প্রতিনিধি) ভাইকে আগেই বলা হয়েছিল। আমরা আলম নামের এক ছেলের সন্ধানে এসেছি। মরিচপুরাণ গ্রামের ৫/৬ বছরের এই ছেলে নাকি যার মাথায় হাত বুলাচ্ছে তার মনের বাসনা পূরণ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে অনেক জটিল রোগের নিরাময়ও নাকি মিলছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার লোক ছুটে আসছে আলম পীরের কাছে। পুরো দেশজুড়ে আলম আলোচনায়। ওর ওপরই রিপোর্ট করতে আসা, আসলে হচ্ছেটা কি? নালিতাবাড়ি বাজারে নেমে হীরা ভাইকে ফোন করলাম। ২০ মিনিটের মধ্যে তিনি হাজির। কুশল বিনিময় করতে করতে হেঁটেই চলে এলাম জেলা পরিষদ ডাক বাংলোতে। হীরা ভাই সব ব্যবস্থা করে, রাতের মতো বিদায় নিলেন। ধকল তো আর কম যায়নি, ঘুম আসতে দেরি করলো না। সকালে অপারেশনёবাচ্চা হুজুর আলম।

সকালে উঠে আলমের গ্রামে যেতে প্রস্তুত হচ্ছি তখন হিরা ভাই দুঃসংবাদটা দিলেন, আলম পীরের দরবার শুক্রবার বন্ধ থাকে। আজ ১৭ জুলাই (২০০৯), শুক্রবার। ভেবেছিলাম সকাল থেকে পীরের পীরগিরি অবজার্ভ শেষে রাতের বাসেই ঢাকা ফিরবো। একটি দিন বেড়ে গেল, নষ্ট হলো। আজ সারাদিন কি করবো? এ প্রশ্নে হীরা ভাই বেশ অবাক হলেন, কি করবেন মানে! শেরপুর ঘুরবেন। আমি একজনকে ঠিক করে দিচ্ছি, যান মধুটিলা ইকোপার্ক দেখে আসুন, ভালো লাগবে। রাজি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
একটি নাজুক অবস্থার হোন্ডা-এইটি নিয়ে বাংলোতে হাজির হলেন মঞ্জু নামের একজন। দুজনে হোন্ডায় উঠলাম। মঞ্জু ভাই ঢাকার সাংবাদিকদের পেয়ে খুবই উৎসাহী। মোট ৫টি কিকের পর হোন্ডাটা স্টার্ট নিল। ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা শঙ্কা বোধ করলাম। বিকট গর্জন করতে করতে ধিমে গতিতে ৩টি প্রাণীকে নিয়ে প্রাণ যায় যায় অবস্থার হোন্ডাটা রওনা হলো।
পাকা মসৃণ পথ পাড়ি দিয়ে ৪৫ মিনিটের মধ্যে চলে এলাম ঝিনাইগাতি উপজেলার ব্রিজপাড়। সামনে মধুটিলা ইকোপার্কের বিশাল তোরণ। সাংবাদিক বলে মোটরসাইকেল নিয়ে ইকো পার্কে ঢুকে যেতে অসুবিধা হলো না। পার্কে ঢুকতেই দেখা গেল মধুটিলা পার্কের মিনিয়েচার। পার্কের এই ছোট্ট মডেলটি দেখে জানা যায় পার্কের কোথায় কি আছে। মোটরসাইকেল চলছে, ধীরে ধীরে গাছের সংখ্যা বাড়ছে, ঘন হচ্ছে সবুজ। এখানে সেখানে তৈরি করা হয়েছে হাতি, বাঘ, ডায়নোসারের ডামি এবং কৃত্রিম ফোয়ারা। একটি ছোট্ট লেকের সামনে এসে মঞ্জু ভাই মোটরসাইকেল থামালেন, এখান থেকে হাঁটা শুরু। বুঝলাম আমরা ঘন বনের গর্ভে চলে এসেছি। যতদূর চোখ যায় শুধু অকৃত্রিম সবুজের সমারোহ। সবুজে আচ্ছন্ন পাহাড়-টিলা, মাথার ওপরে নীরব নিখাদ নীল নীলিমা, মাঝে মাঝে সাদার পোঁচ। মধুটিলার একমাত্র রেস্টহাইজটি যে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত, সে পাহাড়টিতে খাড়াই ওঠা শুরু করলাম।  ক্যামেরার শাটার টেপা কিন্তু বন্ধ নেই। মুগ্ধ হচ্ছি, আর ক্যামেরাবন্দি করছি পাহাড়ের সবুজ শরীর। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে এক মনোরম দৃশ্য দেখলাম। অসাধারণ! অদ্ভূত! মনে হচ্ছে আকাশ থেকে পৃথিবীটাকে দেখছি। দিগন্তজোড়া সবুজের বিস্তার, পাহাড়ের শরীরের ভাঁজ, পাহাড়ের ঢেউয়ের পর সমতল সবুজ মাঠ আর মাঠের শেষে আসামের উঁচু উঁচু গাঢ় সবুজ পাহাড়ের অস্পষ্ট ছবি। আমরা যে পাহাড়টিতে আছি তা থেকে সরু সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে, পশ্চিম দিকে; আমার সাথের দুজনকে রেখে আমি একাই সাবধানে নিচে নেমে এলাম। খাড়াই সিঁড়ি ভেঙে যতদ্রুত সম্ভব পশ্চিমের আরেকটি উঁচু পাহাড়ে উঠে গেলাম। উঠে বেঞ্চে বসে হাঁপাতে লাগলাম। দেখলাম এই পাহাড় থেকে আরো বেশি ভালো করে চারপাশটা চোখে পড়ে। দেখলে মনে হয়, পুরো পৃথিবীটাই সবুজময়, সীমা নেই। মধুটিলা ইকো পার্কের কিন্তু সীমা আছে। এই পার্কের আয়তন ৪০ হেক্টর। সমসচূড়া মৌজার এই মধুটিলা রেঞ্জকে ২০০৩ সালে ময়মনসিংহ বন বিভাগ ইকো পার্ক হিসেবে ঘোষণা করে। মধুটিলা পার্ককে অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্যের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা বললে ভুল হবে না। পাখি ছাড়া তেমন কোনও প্রাণীর দর্শন যদিও পাইনি।
 

অপূর্ণ ও মঞ্জু ভাইও এই পাহাড়ে উঠে এলেন। মঞ্জু ভাই বললেন, চলেন গিয়ে ওয়াচটাওয়ারে উঠি। ওয়াচটাওয়ারে উঠতে আমরা নিচে নেমে এলাম। লেকের পাড় ধরে আমরা হাঁটছি, উঁচু-নিচু লাল মাটির কাঁচা পথ। লেকের ওপরে অনিন্দ্য নকশার ব্রিজ সোনায় সোহাগা। নৌকায় করে লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করার ব্যবস্থা আছে। উঁচু উঁচু গজারি, শাল, বাঁশঝাড় ও লম্বা লম্বা ঘাসের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা পাকা রাস্তায় গিয়ে উঠলাম। যেন সবুজে ডুব সাঁতার দিচ্ছি। গাছের ছায়া রাস্তায় এঁকেছে বিমূর্ত সব ছবি। পুরো বন পাখির ডাকে মুখরিত, কোকিল, বুলবুল, নীলকণ্ঠ, ডাহুক আরো কত নাম না জানা পাখির ডাকাডাকি।
মোটামুটি উঁচু একটি টিলায় দাঁড়িয়ে আছে ওয়াচটাওয়ার। প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে টাওয়ারের মাথায় উঠে গেলাম। এর চূড়া থেকে উত্তর দিকের আসামের কালচে সবুজে মোড়া পাহাড়গুলো বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। টাওয়ার থেকে বেশ কিছু ল্যান্ডস্কেইপ ফ্রেমবন্দি করলাম। ক্যামেরা সাথে না থাকলে আফসোস রয়ে যেতো। যেহেতু আমরা মধুটিলার সবচেয়ে উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে আছি তাই দূরদূরান্ত পর্যন্ত ভালো ভাবে দেখা যাচ্ছে। সবুজ কার্পেট বিছিয়ে দেয়া হয়েছে যেন দিগন্ত পর্যন্ত। প্রচ- গরমের মধ্যেও ঝিরিঝিরি হিমেল  বাতাস শরীরে স্বস্তি আনে, এক বুক নিঃশ্বাস দেয় প্রশান্তি।
টাওয়ার থেকে নেমে আমরা মোটরসাইকেলের দিকে হাঁটা দিলাম। দুচোখের ক্যানভাসে সবুজ-নীল-সাদা-ধূসর রঙে আঁকা একটি অনবদ্য চিত্রকর্ম নিয়ে ইকো পার্ক থেকে বের হলাম। মধুটিলা প্রকৃতির এক বিস্ময়। মনে রইল হীরা ভাই ও মঞ্জু ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা।     
পুনশ্চ। সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পার্ক খোলা থাকে। প্রবেশমূল্য ৫টাকা। রেস্টহাইজ রয়েছে যা শুধুমাত্র দিনের বেলার জন্য ভাড়া নেয়া যায়, ৪ হাজার ৫শ টাকায়; স্যুটিং-এর জন্য ভাড়া ১ হাজার টাকা (৮ ঘণ্টা), ওয়াচটাওয়ারে আধ ঘণ্টা অবস্থানের জন্য জনপ্রতি মাত্র ২ টাকা এবং নৌকা ভাড়া আধ ঘণ্টায় জনপ্রতি ৬ টাকা।
ছবি : লেখক      

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology