ময়মনসিংহ

নজরুল স্মৃতির ত্রিশালে

প্রকাশ : 31 মে 2011, মঙ্গলবার, সময় : 10:00, পঠিত 3243 বার

রাজীব পাল রনি
মানুষ ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে অজানাকে জানার উদ্দেশে শহরের কোলাহল থেকে নির্জনতা পেতে। তাই বন্ধুরা মিলে গরমের ছুটিতে বেড়ানোর প্রস্তুতি নেই। আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে সিন্ধান্ত নিলাম আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে যাওয়ার। বন্ধুদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা তুলে তারিখ ঠিক করলাম। একটি মিনি বাস ভাড়া করে নির্দিষ্ট দিনে ঢাকা থেকে রওনা হলাম। সেদিন ছিল শুক্রবার। সকাল ৮টায় আমাদের বাস ছাড়ল। বাসের জানালা দিয়ে দেখি মেঘলা আকাশে সোনালি সূর্য উঁকিঝুঁকি মারছে। সেদিন পরিবেশটা খুব সুন্দর ছিল, প্রফুল্ল মন নিয়ে এগিয়ে চলছি। ত্রিশালে পিকনিকে যাওয়া আজকের নয়, দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল ১১০ কিলোমিটারের পথ। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ কবিতা কেউ বা গান পরিবেশন করতে লাগলেন। বন্ধুদের মধ্যে রুপন, রাজু, সঞ্চিতা, ইশতিয়াক, তুষার, জসিম, কবির, জাহাঙ্গীর, কাউসার, পিয়স্তি, মুক্তা আমিসহ আরও অনেক বন্ধু আমাদের সঙ্গী ছিল। আসলে আমরা সবাই ছিলাম নজরুল প্রেমিক। কবির ভাষায় বলা যায় আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে, মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর, টগবগিয়ে খুন হাসে, আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। ঘণ্টা দুই পর প্রত্যাশিত সেই ত্রিশালে এসে পৌঁছি। তখন সকাল ১০টা। উল্লসিত মন নিয়ে সবাই এক এক করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। আমরা প্রথমে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাল্য বিদ্যাপীঠ সাবেক দরিরামপুর উচ্চবিদ্যালয় বর্তমান নজরুল একাডেমি নামে খ্যাত, সেখানে প্রবেশ করি। নজরুল এ স্কুলে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীতে পড়াশোনা করেছেন। নজরুল যে দুটি শ্রেণীকক্ষে পড়তে বসতেন, তার একটির সামনে মর্মর পাথরে খোদাই করে রাখা হয়েছে কবির নিজ হাতের লেখা আমি এক পাড়াগেঁয়ে স্কুল পালান ছেলে, তার ওপর পেটেডুবুরি নামিয়ে দিলেও ক অক্ষর খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্কুলের হেড মাস্টারের চেহারা মনে করতেই আমার আজও জলতেষ্টা পেয়ে যায়। অল্প কিছু এগিয়ে গেলে সামনে নজরুল ডাকবাংলো। এর সঙ্গেই নজরুল মঞ্চ, যেখানে কবি নজরুলের জজয়ন্তি ১৯৬৪ সাল থেকে প্রতিবছর পালিত হয়ে আসছে। মঞ্চের পশ্চিম দিকে পাথরে লিখা কবি নজরুলের সংক্ষিপ্ত জীবনী খোদাই করে দেয়া আছে। তা পড়ে আমরা নজরুল সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য পেলাম। তারপর  আমরা সবাই মিলে অল্প কিছুক্ষণ পায়ে হেঁটে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নামাপাড়ায় বটতলার কাছে এসে থামলাম। স্কুল পালিয়ে নামাপাড়া যে বট গাছের নিচে কবি নজরুল আপন মনে বাঁশিতে সুর তুলতেন। এই সেই বটগাছ আমাদের দেখিয়ে দিল বন্ধু রুপন। সেই গ্রাম, বটগাছ বন্ধু রুপনের খুব পরিচিত। কারণ রুপন আমাদের এ পিকনিকের আগে আরও দুবার এখানে এসেছে। কিন্তু বটগাছ দেখে আমরা তো অবাক। সত্যিই কি আমরা নজরুল বটবৃক্ষে? সঞ্চিতা আহারা হয়ে বলল। এদিকে  বন্ধু জসিম বলল, আমার গায়ে একটি চিমটি কাটনা, আমি স্বপ্ন দেখছি না তো! আমরা তাদের কথা শুনে পুলকিত হই। তারপর আমরা বটগাছের চারদিকে গোল করে বসলাম। তখন খাড়া দুপুর। এখানেই দুপুরের খাবারটা সেরে নিয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। এ বৃক্ষের পাশেই দেশের প্রথম ও একমাত্র সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। ঘুরতে ঘুরতে আমরা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে চলে এলাম বিচুতিয়া বেপারী বাড়িতে। এ বাড়িতে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে কিছু দুর্লভ ছবি যুদ্ধফেরত নজরুলের ছবি, তিন বন্ধু অধ্যাপক হেমন্ত সরদার, হাবীবুল্লাহ বাহার ও নজরুলের ছবি। চুরুলিয়া যে গৃহে নজরুল জগ্রহণ করেন সে ছবি, কৃষ্ণনগরে-নজরুল পরিবার; নজরুলের কোলে শিশুপুত্র বুলবুল, কবি পতী-প্রমিলার ছবি, বংশীবাদনরত নজরুল, ধ্যানমগ্ন কবি, হাবিলদার বেশে নজরুল ২১ বছর বয়সে, সঙ্গীত স্রষ্টা নজরুল, কিশোর বয়সে ও মধ্য বয়সে নজরুলের ছবি এখানে রয়েছে। এছাড়া গ্রামোফোন, বৈদ্যুতিক এলপি রেকর্ডারসহ আরও অনেক কিছু দেখে এখান থেকে রওনা হয়ে যাই কাজির শিমলায় দারোগা বাড়ি। বিচুতিয়া থেকে কাজির শিমলা দারোগা বাড়ি ২০ মিনিটের পথ। কাজির শিমলা দারোগা বাড়ি যেখানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ দেশে প্রথম পদার্পণ ঘটেছিল। কিশোর নজরুলের সু-কুমার চেহারা, নম্র স্বভাব ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে কাজী রফিজউল্লাহ দারোগা ১৯১৪ সালে আসানসোলের রুটির দোকান থেকে কিশোর কবি নজরুলকে কাজির শিমলায় নিজ গ্রামে নিয়ে আসেন। প্রথমে এই দারোগা বাড়িতেই অস্থান করেন কবি। এখানে রয়েছে দোতলাবিশিষ্ট নজরুল পাঠাগার ভবন। এই পাঠাগারে কবিতা ও গানের বই রয়েছে। এ বাড়িতে আছে কবির ব্যবহত খাট। কবির প্রিয় পুকুর ঘাটটি, যেটি শান দিয়ে বাঁধানো। দেখতে খুবই সুন্দর। দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল অত্যাচারিত, শোষিত শ্রেণী বৈষম্য পীড়িত মানুষকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ চেতনায় তার লেখা বল বীর উন্নত মমশির, যে দিন উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, আমি সেই দিন হব শান্ত, বল বীর উন্নত মমশির কবিতার লাইনগুলো হঠাৎ চোখে পড়ল, পশ্চিম আকাশের সূর্য ঢলে পড়েছে। এবার বিদায়ের পালা। কিন্তু মন যেন ত্রিশালকে বিদায় দিতে চাইছে না। তবুও যেতে তো হবে, তাই আমরা সবাই বাসে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। আমরা নজরুলের টানে গিয়েছিলাম ত্রিশালে। ত্রশাল ভ্রমণে স্মৃতি মনের গহিনে থাকবে আমাদের চিরকাল।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology