ময়মনসিংহ

পরিচিত নদী অপরিচিত পাহাড়ি গ্রাম

প্রকাশ : 21 মার্চ 2011, সোমবার, সময় : 10:01, পঠিত 3545 বার

লুৎফর হাসান
বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছেলে হয়েও আমার জানা ছিল না, আমাদের অঞ্চলের একেবারে উত্তর অংশে কি অপার সৌন্দর্য আছে। সারাবেলা যাকে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। প্রতিনিয়ত অনেকেই সেখানে যাচ্ছে আর প্রকৃতির উদারতায় মিলেমিশে একাকার হয়ে ঘরে ফিরছে সীমাহীন ভালোলাগা নিয়ে। অবশেষে নিজেকে অপরাধীর তালিকা থেকে মুছে ফেলার উদ্যোগ নিয়ে ঢাকা ছেড়ে বের হলাম সেই মুগ্ধতার মায়াজালে বাঁধা পড়তে। রাজধানীর মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে নেত্রকোনাগামী একটি বাসের টিকিট করলাম। আমি, রনি, সোয়েব আর ফিরোজ মিলে রওয়ানা হলাম সুসং দুর্গাপুরের উদ্দেশে। ময়মনসিংহ পর্যন্ত যেতেই রাত হয়ে গেল। তারপরও অন্ধকারকে সঙ্গী করেই বাস এগুতে লাগল। দেড় ঘণ্টা পর একটা ভাঙা ব্রিজের গোড়ায় বাসটা থেমে গেল। এরপর আর বাসে যাওয়া যাবে না। তাহলে উপায়? উপায়টা সাজানোই আছে। দুর্গাপুর অঞ্চলের যুবকদের কর্মসংস্থানের একটি পথ। ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালকের পেছনে দুইজন আরামেই বসা যায়। তবে কতটা আরামে এ মোটরসাইকেল ভ্রমণ শেষ হয় বুঝলাম ব্রিজটা পার হতেই। পৃথিবীর অন্যতম কঠিন যোগাযাগ ব্যবস্থা এ দুর্গাপুরের পথেই। আঁকাবাঁকা এবড়োথেবড়ো পথ। ইট বিছানো পথের যেখানে-সেখানে গর্ত। মোটরসাইকেল চালক বিকল্প পথ খোঁজেন। কেমন সেই বিকল্প পথ? রাস্তা থেকে নেমে সদ্য ধানকাটা মাঠের ওপর দিয়ে যাত্রা। আহা। আর কতক্ষণ পর আমাদের গন্তব্য? বাসে গেলে পৌঁছে যেতাম চল্লিশ মিনিটেই। মোটরসাইকেল চালক বললেন, এই তো, এসে গেছি। অবশ্য তার এ কথাটা এরই মধ্যে অনেকবারই শুনেছি। এবার সত্যিই চলে এলাম। রাত ১০টা বাজে। ব্যক্তিগতভাবে আমি ক্লান্ত হয়ে গেলেও শোয়েব আর ফিরোজ একটুও ক্লান্ত নয়। তারা দুজন নাকি কখনই ক্লান্ত হয় না। রনি অবশ্য চনমনে ভাব দেখায়, তবে একটু হেলান দেয়ার মতো কোন অবলম্বন পেলেই হল! ঘুমে বিভোর হয়ে যায়। ডাকবাংলোতে বড় একটা রুম পেয়ে গেলাম। টানা এক সপ্তাহ থাকব। আজ খেয়েদেয়ে একটা ঘুম দেব এটাই পরিকল্পনায় ছিল। আসলে বেড়াতে গেলে সব পরিকল্পনাই ভেস্তে যায়। যার যার মতো আমরা ফ্রেশ হলাম। তারপর স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। হরেক পদের বাহারি সব তরকারি দিয়ে ভোজন পর্ব শেষ হওয়ার পর বিল এসেছে জনপ্রতি মাত্র পঞ্চাশ টাকা। অবাক হওয়ার প্রথম পর্বের সঙ্গে পরিচিত হলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর রুমে ফিরব ভাবছিলাম। শোয়েব আর ফিরোজ গো ধরল নদীর পাড়ে যাবে। হেঁটে গেলে দুমিনিটের পথ। আমরা নদীর ঘাটে গেলাম। খা খা জোসনা ভরা রাত। ঝকঝকে সোমেশ্বরীর রূপ যেন উছলে পড়ছে। সেই অপরূপ সৌন্দর্যের শরীর ছেনে দেখার তাড়নায় ঘাট থেকে একটা নৌকা ভাড়া করলাম। ঘণ্টায় পঞ্চাশ টাকা। কোথায় যাব? কোন উদ্দেশ্য নেই। নৌকা চলছে। রাত এখন ১২টা। এ মধ্যরাতে সোমেশ্বরীর বুকে ছোট্ট একটা নৌকায় মাঝির সঙ্গে আমরা চার বিদগ্ধ যুবক। নদী আর জোসনার মাখামাখি আরও বেশি ব্যক্তিগত করে নেয়ার প্রলোভনে মাঝিকে বললাম নেমে যেতে। মাঝি এক কথাতেই সায় দিল। আরেকটা নৌকায় সে চলে গেল ঘাটে। এখানকার মানুষেরা বড় বেশি সহজ, বড় বেশি সরল, মানুষের প্রতি মানুষের পরম মমতা বড় বেশি আঁঠালো। মাঝি চলে যাওয়ার পর নৌকার বৈঠা অথবা লগি দুটোই হাতের কাছে রেখে দিলাম। সোমেশ্বরী হঠাৎ হঠাৎ বাতাসের দোলায় দুলে উঠছে, দুলে উঠছে স্বচ্ছ জলের আয়নায় ভরা পূর্ণিমার থলথলে চাঁদ। গলা ছেড়ে আমরা গান গাইছি। আবোল-তাবোল বকছি, হাসছি, কাঁদছি। চিৎকার করছি। এমন নিস্তব্ধ নদী এ জনমে আর যে দেখিনি। জোসনার আলো ছড়িয়ে পড়েছে দূর পাহাড়ের গায়ে। উঁচু উঁচু পাহাড়কে মেঘের মতোই লাগছিল। পাহাড়টি খুব কাছেই। আগামীকাল আমরা ওই পাহাড়ের কাছে যাব। এখন এ আবেগের মায়াজাল ছিঁড়ে আমাদের বাংলোতে ফিরতে হবে। আমরা ফিরে এলাম। রাতের জোসনায় যে সোমেশ্বরীকে দেখে এসেছি, দিনের আলোয় তাকে দেখব বলে আমরা ঘুমোতে গেলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা রওয়ানা হলাম। এবার সোমেশ্বরীর বুক চষে আমরা যাব পাহাড়ের দিকে। আমাদের সঙ্গী হল আকাশ নামের এক অপরিচিত লোক। আকাশ কথা বলে কম। তবে তার অভিজ্ঞতার প্রমাণ পেতে লাগলাম আস্তে আস্তে। বাংলাদেশের সব ধরনের আদিবাসীদের ভাষা তার আয়ত্বে। রুপালী আর নীলাভ এ দুই রঙের মিশেল এ সোমেশ্বরী নদী। এমন একটি নদী দেখেছিলাম জাফলংয়ে। তাছাড়া নদীমাতৃক এ দেশে আর কোন নদীর রঙ এমন দেখিনি। নীল নীল জলরাশি ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমরা একটি অপরিচিত জায়গায় চলে এলাম। আকাশকে প্রশ্ন করলে ধমক খেতে হয়। আমরা সাইনবোর্ড খুঁজতে লাগলাম। অবশেষে আমাদের অনুসন্ধানী ভাব দেখে আকাশ নিজে থেকেই বলল, জায়গাটার নাম বাদামবাড়ি। এটা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকা। আকাশকে অনুসরণ করতে করতে আমরা নাকি বিডিআর ক্যাম্পকে ফাঁকি দিয়ে এসেছি। উঁচুনিচু পাহাড়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে একটি জনপদে পৌঁছে গেছি। কোথায় এলাম? আকাশ কোন কথা বলে না। আদিবাসী এক মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম এ জায়গার নাম কী? সে বাংলা বোঝে না। একটু পরে টের পেলাম। বাংলাদেশের সীমানা ছেড়ে মেঘালয়ের অনেকটা ভেতরে নিয়ে এসেছে আকাশ নামের এ ধূর্ত লোকটি। আমি ফিরে যেতে উদ্যত হতেই শোয়েব, ফিরোজ আর রনির সঙ্গে মোটামুটি একটা ঝগড়াই বেধে গেল। তাদের কথা ঢুকে যখন পড়েছি, কিছুক্ষণ বিচরণ করতে দোষ কী? উঁচু উঁচু পাহাড়, পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে একটু-আধটু সমতল। সেই সমতলে ধানক্ষেত। আর ধানক্ষেত পাহারা দেয়ার জন্য টং। পাগলা হাতির অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য এ টং বানানো হয়েছে। অবৈধভাবে এ সৌন্দর্যমণ্ডিত জায়গায় বিচরণ করতে করতে একবার মনে হল, বিপদ হতে পারে। এবার ফিরে যাওয়াটাই ভালো। হাতে-পায়ে ধরে ফিরোজ আর শোয়েবকে রাজি করালাম, তখন সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই। পাহাড়ের পাড়ায় পাড়ায় মাটির পিদিম জ্বলে উঠছে, আকাশের পিছু আমরা হাঁটছি। আবারও কোন এক অচেনা-অজানা পাহাড়ের ফাঁক-ফোকর দিয়ে রাস্তা বের করে বাংলাদেশের গণ্ডিতে নিয়ে এল আকাশ। এভাবে কাউকে অনুসরণ করা উচিত হয়নি। এভাবে অপরিচিত কারও সঙ্গে হুট করে কোথাও যাওয়া কোনভাবেই ঠিক না। তবুও সবার মতো আমিও মনে মনে আকাশকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। এ ভবঘুরে মানুষটিকে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলাম বলেই অখ্যাত অথচ অপরূপ সৌন্দর্যে মোড়ানো একটি পাহাড়ি গ্রাম নিজের চোখে দেখে এসেছি। হয়তো আবার সোমেশ্বরীতে যাওয়া হবে, কিন্তু কখনই কি ওই পাহাড়ের ছোট্ট গ্রামটিতে যেতে পারব? গাদা গাদা প্রশ্নেরা ভাবনার জগৎ ভারী করে দেয়। প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যায়। কেবল চোখের সামনে ভেসে ওঠে সোমেশ্বরীর ওপারের উঁচু উঁচু পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সেই হাজংদের গ্রাম। যেখানে শোয়েব রেখে আসে তার পছন্দ করা পাহাড়ি মেয়েটিকে, ফিরোজ আর রনি রেখে আসে আমার প্রতি তাদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ। আর আমি রেখে এসেছি উদার আকাশের মতো, বাউণ্ডুলে অথচ নিঃস্বার্থ একজন ভালো মানুষকে। আকাশ তুমি ভালো থেক। ভালো থাকুক তোমার পাহাড়ের হাজংয়েরা।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology