ময়মনসিংহ

কড়ইতলীতে দূর পাহাড়ের হাতছানি

প্রকাশ : 21 মার্চ 2011, সোমবার, সময় : 10:04, পঠিত 4915 বার

সালেক খোকন
শাপলাবাজার মোড় পার হতেই ভাগ হয়ে যায় রাস্তাটি। পাল্টে যায় চারপাশের দৃশ্য । রাস্তার ওপাশে দূরে বড় বড় পাহাড়। দৃষ্টির দুই পরতেই শুধু পাহাড় আর পাহাড়। একটির পেছনে আরেকটি। যেন একটি আরেকটির ছায়া। সব পাহাড় আকাশমুখী। কোন কোনটিকে ঘন মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে। সেখানে মেঘের সঙ্গে পাহাড়ের যেন মিতালী চলছে। কোন কোন পাহাড়ে ঝুম বৃষ্টি। আবার মেঘের ফাঁক বুঝে এক রাশ রোদের আলো এসে পড়েছে কোনও কোনওটিতে। এক পাহাড়ে যখন বৃষ্টি, অন্যগুলোতে তখন রোদ। এভাবে প্রতিদিন পাহাড়ের গায়ে চলে রোদবৃষ্টির খেলা। কেউ কেউ ভাবতে পারে এটি নিশ্চয়ই পার্বত্য জেলার নয়নাভিরাম কোনও স্থান হবে। কিন্তু এ সব ধারণাকে তুড়ি বাজিয়ে উড়িয়ে দেয়া যায় যদি কেউ চলে আসে হালুয়াঘাটের কড়ইতলীতে।
পাহাড় ভালো লাগা থেকে সুনীল বলেছিলেন, পাহাড় কিনবেন।  সে রকম ইচ্ছা করার দুঃসাধ্য না থাকলেও দূর পাহাড়ের ধারে যেতে কার না ভালো লাগে? পাহাড় দেখার আনন্দ পেতে কাকডাকা এক ভোরে ব্যস্ত ঢাকা থেকে চলে আসি পাহাড়ের পাদদেশের শহর হালুয়াঘাটে। খবর পেয়ে সঙ্গী হয় দুই বন্ধু। সোহরাব আর মৃদুল।
ঢাকার খুব কাছের জেলা ময়মনসিংহ। এ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলাকে ঘিরে রেখেছে মেঘালয়ের মেঘছোঁয়া বড় বড় সব পাহাড়। মুক্ত আকাশে এখান থেকেই দেখা যায় তুরা পাহাড়টিও।
নামটি কেন হালুয়াঘাট? উত্তর জানতে দৃষ্টি ফেরাতে হবে বেশ পেছনের দিকে। ১৬৫০-১৭০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোন এক সময়ের কথা। তখন দর্শা নামক নদীর ঘাট হয়ে নৌপথে এ অঞ্চলের সব ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হতো। হালুয়া অর্থ চাষী। হাল চাষীরা নানা কাজে এ ঘাট ব্যবহার করত বলেই এর নাম হয়েছে হালুয়াঘাট। অর্থ দাঁড়ায় হালুয়াদের ঘাট। আবার অনেকেরই এ বিষয়ে মত একেবারে ভিন্ন।  ঘাটটি হালুয়া নামক ব্যক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল বলেই নাকি এর নাম হয়েছে হালুয়াঘাট। নাম নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে কিন্তু কোন মতভেদ নেই।
হালুয়াঘাটে যখন পৌঁছি সময় তখন সকাল সাড়ে ৯টা। একটি রিকশায় চেপে আমরা চলে আসি বাজারের শেষ প্রান্তের হোটেল । হোটেল বয় রাসেল বেশ চটপটে। র্হ র্হ করে বলতে থাকে হালুয়াঘাটের কিছু জায়গার নাম। সূর্যপুর, পানিহাতা আর কড়ইতলী। এ জায়গাগুলো থেকেই মেঘালয়ের সব পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে কাছের জায়গাটি কড়ইতলী। কড়ইতলী বিজিবি ক্যাম্পের পাশ দিয়ে একটি রাস্তা চলে গেছে শেরপুরের দিকে। আর অন্যটি সূর্যপুর হয়ে ধোবাউড়া উপজেলায়। এ দীর্ঘ রাস্তার একপাশের মেঘালয় সীমান্তে ছায়ার মতো ঘিরে আছে শুধুই পাহাড়। পাহাড় থেকে সীমানা অতিক্রম করে মাঝে মধ্যে দলভেদে নেমে আসে হাতি কিংবা মায়াবী হরিণ। গল্পের মতো এরকম তথ্যে আমরা ঠিক থাকতে পারি না। রওনা দেয়ার প্রস্তুতি নেই। ঠিক সে সময় রাসেল জানালো কড়ইতলীতে মিলবে না কোন দোকানপাট। অগত্যা অসময়েই খেতে হবে দুপুরের খাবার। রাসেলের কাছ থেকে জেনে নেই খাবার হোটেলের ঠিকানাটি।
বাজারের ভেতর বেশ কয়েকটি হোটেল। কিন্তু সেগুলো ফেলে আমরা চলে আসি থানার পাশে জসিমের ছোট্ট হোটেলটিতে। খানিকটা ঘরোয়া ঢঙের ছোট্ট হোটেলটিতে মেলে হাঁসের মাংস। বাড়ির স্বাদের রান্নায় খেয়ে নেই ঝটপট। খাওয়া শেষে পান চিবুতে চিবুতে দুটি রিকশায় রওনা হই কড়ইতলীর উদ্দেশে।
কড়ইতলী গ্রামটি গোবরাকুড়া ইউনিয়নে, হালুয়াঘাট শহর থেকে মাত্র ৭ কিমি ভেতরে।  রিকশার প্যাডেল ঘুরতেই বাজারকে পেছনে ফেলে আমরা উত্তরদিকে এগুতে থাকি। যতই সামনে যাচ্ছি ততই যেন ভালোলাগা সব দৃশ্য আমাদের ঘিরে ধরছে। রাস্তার দুদিকে ধান ক্ষেতের ফাঁকে ফাঁকে নানা জাতের সবুজ গাছ। কোথাও তাল গাছ, কোথাও বা খেজুর। কোথাও বীজতলার টিয়া রঙ, কোথাওবা সবুজে সবুজ ধানক্ষেত। এভাবে ছবির পরে ছবি ফেলে আমরা সামনে এগুই। একটি জায়গাতে অন্যরকম এক গন্ধ। রিকশাওয়ালা জানাল এটি পাট পচা গন্ধ। তাকিয়ে দেখি রাস্তার পাশের ডোবার মধ্যে জনাকয়েক কৃষক পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছে। অন্য একটি জায়গায় এসে আমরা রিকশা থামাই। রাস্তার পাশে ধান ক্ষেতে জমেছে হাঁটু অবধি বৃষ্টির পানি। লম্বা লম্বা পা নিয়ে সে পানিতে নিঃশব্দে মাছ ধরছে  এক ঝাঁক পাহাড়ি বক। সবুজের বুকে সাদা বক। কি যে অদ্ভুত! মনে হচ্ছিল সবুজ আঁচলে কোন শিল্পী যেন ভালোবাসার তুলি দিয়ে সাদা আঁচড় বসিয়ে দিয়েছে। গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা হয়ে আমরা চলে আসি শাপলাবাজার মোড়ে। মোড়ের দুদিকে চলে গেছে রাস্তার দুটি অংশ। একটি গেছে অনেক দূরে দৃষ্টিসীমার ওপারে, সবুজ প্রান্তরে। ঠেকেছে একেবারে সূর্যপুর বাজারে গিয়ে। আমরা ওপাশটায় এগোই না। মোড় থেকে বামদিকে কড়ইতলীর রাস্তা। আমাদের রিকশাটি এগোয় সে পথে। কড়ইতলীর দিকে যতই এগুচ্ছি ততই আমাদের দৃষ্টি যেন স্থির হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, কোন স্বপ্নময় দেশে যেন আমরা চলে এসেছি। স্বর্গীয় পরশ নিয়ে মৃদুমন্দ বাতাস বইছে চারপাশে। দৃষ্টির সামনে পাহাড়গুলো যেন আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। গায়ে গায়ে লাগানো উঁচু-নিচু সব পাহাড়।
মৃদুলের এসএলআরের শব্দ যেন থামছেই না। রাস্তার পাশেই ফসলের মাঠ। গোটা মাঠেই ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত গারো নারীরা। একজন গারো নারীর সঙ্গে কথা হয় আমাদের। নাম জানাল, বন্যা রংমা। এ সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের বিশ্বাস নারীর হাতে রোপিত গাছ থেকে অধিক ফসল মিলে। তাই হাঁটু অবধি কাদায় নেমে আশীর্বাদের পরশ দিয়ে চারা রোপণ করছে তারা। পাহাড় দেখতে দেখতে আবিষ্কার করি মাঠের পাশে একটি ছোট্ট খালের। তার ওপরে বাঁশ বিছিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি সাঁকো বিশেষ। এ পথেই যাতায়াত করে আদিবাসী আর বাঙালিরা। কথা হয় কিরিত তিছিম নামের এক গারো যুবকের সঙ্গে। সে জানাল, খাল মনে হলেও এটি আসলে পাহাড় থেকে নেমে আসা একটি ছোট্ট নদী। বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের জলরাশি নিয়ে এটি আছড়ে পড়ে কংস নদীর বুকে। আর সে সময় ভেসে যায় দুপাড়ের লোকালয়। আমাদের চোখের সামনেই পাহাড় থেকে উড়ে আসে বকের ঝাঁক। বকের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ দেখি দূর পাহাড়ে মেঘ ঝরছে। খানিক পরেই বাতাসের ধাক্কায় মেঘ যেন ধেয়ে আসে আমাদের দিকে। আমরা পিছু হটি। সে সুযোগে এক পসলা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দেয় আমাদের শরীরটাকে। ভেজা শরীরে পাহাড়ের দিকে তাকাতে দেখি অন্য দৃশ্য। গোটা পাহাড়ে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া উড়ছে। মনে হচ্ছে, পাহাড়ের বুকে যেন কষ্টের আগুন লেগেছে। স্থানীয়রা জানলো প্রচণ্ড গরমের পর অল্প বৃষ্টি হলেই পাহাড়ে এ রকম ধোঁয়ার মতো বাষ্প ওঠে। এখান থেকেই দেখা যায়, মেঘে ঢাকা তুরা পাহাড়টি। কিন্তু সবাই জানাল সে দৃশ্য দেখতে আসতে হবে শরতে।
এখানে ক্ষণে ক্ষণে বদলায় দূর পাহাড়ের রূপ। কড়ইতলীতে বসে আমরা সেগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখি। বিকাল হতেই নানা ঢঙের মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। নানা জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে গারো নারীরা।  আমরাও মিশে যাই কড়ইতলীর মানুষের মাঝে। মজে যাই দূর পাহাড়ের হাতছানিতে।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology