কিশোরগঞ্জ

হাওরবিলাসী মন

প্রকাশ : 20 অক্টোবর 2010, বুধবার, সময় : 10:09, পঠিত 3201 বার

চৌধুরী ইফতেখার আজিজ
ঈদে মোটরসাইকেলে ভ্রমণের মজাই আলাদা। কোথায় ভ্রমণে যাওয়া যায় তা অবশ্য বন্ধু-বান্ধব সবাই মিলে নির্দিষ্ট করে থাকি। তবে এবার বাইকে ভ্রমণের পাশাপাশি নৌকা ভ্রমণও যোগ করা হয়েছে ভ্রমণ-পূর্ব আড্ডায়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঁচ মোটরসাইকেল নিয়ে দশ বন্ধু বেরিয়েছি ঈদ ভ্রমণে। সবার পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি। কারও কারও মাথায় আছে পাগড়ি।
এবারের ভ্রমণ টিমের নেতৃত্ব দেয়া হয়েছে আমার হাতে। কারণ ভ্রমণ স্পটটি ছিল আমার গ্রামের বাড়ির এলাকায়। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে আমাদের গ্রামের বাড়ি। এ পথে ভ্রমণের উদ্দেশ্য হল, এক ঢিলে বহু পাখি মারা। কারণ এদিক দিয়েই যেতে হয় দেওয়ান ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি। আর আমাদের গ্রাম থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত ভাটি অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র চামড়া বন্দর। মূলত এ কারণেই আমাদের এলাকাটা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্পট। এখানে যেমন বিস্তীর্ণ হাওর থেকে ছুটে আসা ঢেউয়ের শব্দে মনটা প্রফুল্ল হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি হাওরবাসীর দুর্বিষহ জীবনের দীর্ঘশ্বাসে নিজের প্রাণটাও কেঁদে ওঠে।
নানা সমস্যায় জর্জরিত এসব হাওরবাসীর জীবনের চিত্র দেখে যে কারও মনে রেখাপাত করবে। চামড়া বন্দরে দাঁড়িয়ে পূর্ব দিকে তাকালেই এসব চিত্র চোখে পড়ে। দৃষ্টিসীমার একেবারে কিনারে বক্ররেখার মতো কালো আঁকা-বাঁকা, ছড়ানো-ছিটানো অগোছালো গ্রামগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয় অথৈ সাগরের মাঝে কি যেন ভেলার ওপর ভাসছে। বাস্তবিক অর্থে তাদের জীবনটা ভাসমান ভেলার মতোই নড়বড়ে। প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে তাদের টিকে থাকতে হয় হদয়হীন এই পৃথিবীতে। বর্ষাকালে বাড়ির চারপাশে তৈরি করতে হয় আড়া (বাঁশের বেড়া)। এর ভেতর খড়কুটা, কচুরিপানা ভরে স্পঞ্জের মতো করা হয়। যার মাধ্যমে দানব আকৃতির ঢেউ থেকে নিজেদের রক্ষা করে হাওরবাসী। আর বর্ষা মৌসুমে পর্যটকরা এসব এলাকায় ভিড় জমান বিনোদনের জন্য।
হাওরবাসীর যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রচলিত বাক্য হল শুকনায় পাও, বর্ষায় নাও। অর্থাৎ তাদের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হল পানির সময় নৌকা আর শুকনার সময় পায়ে হাঁটা। এছাড়া বিকল্প কোনও ব্যবস্থা নেই যাতায়াতের।
আমাদের ঈদ ভ্রমণের রুটিনে হাওর ভ্রমণটা নৌকার অপর্যাপ্ততার কারণে হয়ে ওঠেনি। তবে আমাদের হাওরবিলাসী মনটা তখন কৃত্রিম এক সমুদ্রের সন্ধান পায়। যার আনন্দে মনটা নেচে ওঠে। সবাই হুড়াহুড়ি করে হাঁটুজলে নেমে পড়ি। আর দিগন্ত থেকে ছুটে আসা ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে আমাদের ওপর। আমরা অনুভব করি পানির উষ্ণ চুম্বন। ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানির স্পর্শে আমার অনেক শহুরে বন্ধু উল্লাসে মেতে ওঠে। প্রকৃতির এই নৈসর্গিক পরিবেশের আদলে অনেকেই হয়ে যায় উদাসী মনের কবি। কেউ বা ফটোগ্রাফারের ভূমিকায় নিজের বিখ্যাত েপটা এখানেই নিতে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। কিন্তু সূর্যের কার্যঘণ্টা এত তাড়াতাড়ি যে শেষ হয়ে যাচ্ছিল, সেদিকে আমাদের লক্ষ্যই ছিল না। দলবেঁধে নীড়ে ফেরা পাখিদের বিষণ মন তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যা দেখে আমাদের মনটাও বিষণ হয়ে যায়। অচেনা এক শ্রেয়সীর রিক্ততায় মনটা অশ্রহীন ভাষায় কেঁদে ওঠে। মনে হল কি যেন ফেলে যাচ্ছি এই সরব ঢেউয়ের মাঝে। পাশাপাশি বিধ্বস্ত ও অবহেলিত হাওরবাসীর প্রফুল্ল চেহারাটাও ভেসে ওঠে হদয়ের মাঝে। এত সংগ্রাম ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিসের মায়ায় তারা এই হাওর অঞ্চলে পড়ে আছে, তাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে চোখের সামনে। সারাদিন ভ্রমণ শেষে এক ধরনের শূন্যতা নিয়েই আমাদের বাসায় ফিরতে হয়। সত্যিই এই ঈদ ভ্রমণ হয়ে থাকবে অবিস্মরণীয়।  


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology