নেত্রকোনা

দেবো তোমায় শালুক পাতার নাও

প্রকাশ : 22 মার্চ 2011, মঙ্গলবার, সময় : 10:13, পঠিত 3708 বার

ফারজানা ইয়াসমিন মৌমি
ঐশী আমাদের ডেকেছিল... ঐশী তা জানতো না। হাওর আমাদের ডেকেছিল... হাওর কি জানতো? ঐশীর গান আর হাওরের অপরূপ রূপ বৈভব, বিপুল বিস্তার আমাদের প্রাণের সুতায় টান দিয়েছিল; এতটা টান আমরাও জানতাম না।
শরতের শুরুতে একদিন সকালে ভাটিবাংলার দুয়ার নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে আমাদের ট্রলার ছাড়ল হাওরের উদ্দেশে। ট্রলারটির যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ২০০ জনের। আমাদের ৩০ জনের একটি ছোট্ট দল। তার মাঝে ১৮ জনই শিশু-কিশোর। ফলে একটি স্বাচ্ছন্দ্য নৌবিহার। শান্ত সুন্দর আলো বাতাাস-আবহাওয়া। একটি সাহিত্য বাসর হচ্ছে হাওরের মাঝে। আছেন কবি রইস মনরম, কবি কামরুল হাসান, কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ, কবি রফিক হাসান আর  কবি ফরিদ আহমদ দুলাল। তাদের নিয়েই শুরু আমাদের ভ্রমণযাত্রা।
ছাড়লাম নাও হাওরে, গাও সবাই প্রাণ খুলে গাওরে...
কংশ নদ বেয়ে মোহনগঞ্জ থেকে বেরিয়ে ধরমপাশাকে পাশে রেখে মধুপুর। মধুপুর পার হতেই শুরু হল হাওর-ধারাম। ধারাম বিল বিস্তারে, বৈচিত্র্যে, বৈভবে বিশাল হাওর। তারপর ধানকুনিয়া, পাকনা আর হালির হাওর।
বিশাল ট্রলারের ছাদের দীঘল দুই পাশে বেঞ্চ পাতা। মাঝখানে বিস্তর ফাঁকা জায়গা। ফলে কয়েকজন মা ব্যতিত কবিরাসহ শিশু-কিশোররা ছাদ থেকে কেউই নামতে চায় না। যথেষ্ট রোদ থাকা সত্ত্বেও কেউ ছাদের নিচে আসতে নারাজ। রোদ ঝলমল উপরের নীল আকাশটিই বুঝি ছাদ। নীলে... দূরে দূরে ছোপ ছোপ সাদা মেঘ। কবিতার বই যেন! নীর মলাটে শুভ্র বলাকার ঝাঁক, গন্তব্যবিহীন উড়াল। ট্রলার ক্রমে হাওরের ভেতরের মাঝ বরাবর যাচ্ছে। বিপুল জলরাশি ধু ধু জল আর জল, দিগন্ত ছুঁয়ে আছে। কোন দিকে দূরের গাঁগুলো যেন একেকটি সবুজ রেখা। উত্তর দিক থেকে নীল ঈশারায় ডাকছে মেঘালয় পাহাড়। শিশুরা গানে কবিতায় কলরবে উল্লসিত উচ্ছ্বসিত। সঙ্গে কবিরাও। ট্রলার চলছে, একটু ধীরে চালাতে বলা হল ধীরে ধীরে চলছে ট্রলার...
ট্রলারের ছাদ থেকে হাওরে লাফিয়ে পড়লেন কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ। পেছন পেছন ফরিদ আহমদ দুলাল, রফিক হাসান। তাদের বয়স তখন ৫০-৬০ নাকি ১৬-১৭? লাফিয়ে পড়ল কয়েকটি কিশোর তরুণও। কাজেই বন্ধ করতে হল ট্রলারের স্টার্ট-ইঞ্জিন। সাঁতারকাটা একই সঙ্গে হাসতে থাকা কবিদের পেটে হাওরের কিছু জলও ঢুকেছিল। দশ মিনিট... পনের মিনিট... জল থেকে এবার ট্রলারে ওঠার পালা। ২০০ জন যাত্রী ধারণের ট্রলারের বাতা (পাশের কিনার) অনেকটা উঁচুতে। তাহলে! অনেক চেষ্টা করে তারা অবশেষে নৌকায় ওঠলেন... তোলা হল। সবাই কাহিল।
ধারাম, ধানকুনিয়া, পাকনা, হালির হাওর, আর সানুয়া, ডাকুয়া হাওর দ্বারা বেষ্টিত জামালগঞ্জ উপজেলা সদর। কাছেই কালনী নদীর পাড়ে গানের পাখি ভাটির কুমার শাহ আবদুল করিমের বাড়ি।
হাওর ছেড়ে এবার সুরমা নদী। সুরমা বেয়ে বিকেলে জামালগঞ্জ শহরটিতে পৌঁছলাম।
ধারাম হাওরের রুই মাছ, সঙ্গে আরও স্বাদু ব্যঞ্জনে আদরে খাওয়া-দাওয়া সারা হল। সন্ধ্যায় উপজেলা মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। কবিদের চেয়ে শিশুরাই সুযোগ পেল বেশি।
রাতে রেস্ট হাউস, গেস্ট হাউসে, ট্রলারের ছাদে আরও গান, আরও কবিতা, ছড়া... জলোয়া বাতাসের ছোঁয়ায় কেউ কেউ ঘুমপরীর দেশে।
পরদিন ফিরে আসার পালা। বিদায়ের সেই পুরনো আবেগ নতুন মাত্রায় সবাইকে কাতর করল। সুরমা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাত নাড়াল সাথী, ঐশী, প্রদীপ, প্রিয়সহ অনেকে। ট্রলার ছাড়ল। জলে-স্থলে অনেকের চোখে বুঝি হাওরেরই টলমল জল।
বলতেই হচ্ছে, ফেরার দিনও সেই কবিরা হাওরের বুকে লাফিয়ে পড়েছিলেন।
আবার কবে দেখা হবে হাওর...?
এমন একটি সুর বাতাসে বাজতে থাকল।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology