নেত্রকোনা

বিরিশিরি-দুগট্টাপুর-বিজয়পুর

প্রকাশ : 25 আগস্ট 2010, বুধবার, সময় : 10:14, পঠিত 8019 বার

রামশংকর দেবনাথ
পাহাড় ছুঁবেন? না-কি প্রকৃতি? মন চাইলে ছুঁতে পারেন দুটোই।
পরিযায়ী পাখিরা আসা-যাওয়া করছে সব সময় আপনারই পাশ দিয়ে গা ঘেঁষে।পাখায় নানা রঙের বর্ণালি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রজাপতি আর পাখির ডানামেলা দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে, কেটে যাবে আপনার সময়।
বসন্তের এই পড়ন্ত বেলায় একটু সময় করে বেরিয়ে পড়ন মন উদাস করা দামাল হাওয়া যেখানে সদ্যজাত কচি কচি কিশলয় ছাপিয়ে মাদার, পলাশ অথবা শিমুলের লাল থকথকে ডানায় ভর করে ঝরনার দুকূল প্লাবিত করে, ভোরের সূর্যটা যেখানে আবির রং ছড়িয়ে উঁকি দেয়। পাহাড়ি নদী সুমেশ্বরীর অববাহিকায় নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে বসবাসরত মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত উপজাতি এবং খনিজ সম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডারের স্বগর্বে কালের কাল অতিক্রম করছে সে অঞ্চল।
শহরের যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে, মনকে সবুজ-সতেজ প্রকৃতির অফুরন্ত ছোঁয়া দিতে আপনার স্বপ্নভূমি-উপজাতি অধ্যুষিত নেত্রকোনার বিরিশিরি দুর্গাপুর বিজয়পুর। পাশেই আকাশের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের মেঘালয় পাহাড়। দেখে মনে হবে আকাশের নীলের সঙ্গে মিতালীতে মেতেছে। আপনাকে দেখে হাতছানি দেবে আদিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়শ্রেণী। সবুজ সুনীল আঁকাবাঁকা পথে যতই অগ্রসর হবেন নৈস্বর্গিক সৌন্দর্যে ততই মুগ্ধ হবেন। আকাশে-বাতাসে থুরি, পহাড়ে-বাতাসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ভড়কে যাবেন না।
পাহাড়ে শীত এখনও মরেনি তাই মোটা কাপড় সঙ্গে রাখবেন। ভাগ্য ভাল হলে পাহাড়ের রোদ মেঘের লুকোচুরি ক্যামেরাবন্দি করতে পারবেন। পথ চলতে চলতেই হরিণ, হাতি বা ময়ূরের দেখা পেয়ে যাবেন। গাছে গাছে হাজারও পাখির আস্তানা, পরিযায়ী পাখিরা আসা-যাওয়া করছে সব সময় আপনারই পাশ দিয়ে গা ঘেঁষে। পাখায় নানা রঙের বর্ণালি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রজাপতি আর পাখির ডানামেলা দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে, কেটে যাবে আপনার সময়। প্রাকৃতিক ভালোবাসায় ভসতে ভাসতে কখনও বর্ডার ক্রস করবেন না।
এখানে ছোটবড় অনেক পাহাড় আছে। যার সবগুলোই পাথুরে পাহাড়। এসব পাহাড়ের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে হাজার প্রজাতির বনজ ঔষধি গাছ। যেগুলোর ওপর নির্ভর করে টিকে আছে বাংলাদেশের বনজ ঔষধালয়। টিলা-পাহাড় ঘুরতে ঘুরতে, সেখানকার অধিবাসীদের আতিথ্য গ্রহণ করে আপনি বুঝতে পারবেন ওরা কত সহজ-সরল জীবনযাপন করে। গারো, হাজং, কোচ, হদি, ভালু ও কানাই প্রভৃতি উপজাতির বাস এ অঞ্চলে। ধর্মে-বর্ণে ওরা সম্পূর্ণ আলাদা। বেশিরভাগ গারো উপজাতি পাহাড়ে বসবাস করে। ওরা মাতৃতান্ত্রিক। আর সমতলে বসবাসরত জাতিগোষ্ঠীর নাম হাজং। এরা সনাতন ধর্মাবলম্বী। বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করে। কৃষিই ওদের প্রধান জীবিকা। এদের পিতৃতান্ত্রিক পরিবার। পাড়া-মহল্লা-গ্রাম-চাকলা-পরগনা এভাবে এদের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে হাজংরা খুবই সচেতন। হাতিখেদা আন্দোলন, টংক আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান অনেক। পরিবারের ছেলেমেয়ে সবাই ঘরে-বাইরে কাজ করে। এরা নিজেদের কাপড় নিজেরা তৈরি করে। এখন অবশ্য আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিচ্ছে। এদের হাতের তৈরি জিনিস (কাঠ, বেতের, বাঁশের) দেখার মতো। মহিলাদের পোশাক-পরিচ্ছদ সবচেয়ে আকর্ষক। ঝরনা বা নদীর ঘাটে একদল তরুণীকে নিমা বা ঘাঘরা পরা অবস্থায় পেয়েও যেতে পারেন স্নানরত। তারা বেশিরভাগই মাটির তৈরি ঘরে বসবাস করে। ঘরগুলো খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। দেয়াল ও মেঝে কাদামাটি আর গোবরে লেপা হয়ে থাকে প্রতিদিন। নিজেরাই আঁকে চমৎকার দেয়াল চিত্র। তারা নিজেদের ভাষায়ই কথা বলে সব সময়। তবে আপনার পাশে বিশুদ্ধ বাংলায় ভাববিনিময় করবে। তাদের নিজস্ব বর্ণমালা না থাকলেও নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা থেমে থাকেনি। ছড়া-গান, কবিতা, প্রবাদ, ধাঁধা, এমনকি উপকথার ব্যাপক সমাহার রয়েছে এদের। সাহিত্য বিচারে যেগুলো লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। নিজস্ব সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে সদা সচেষ্ট তারা।
আধুনিক সভ্যতার হাওয়া ওদের মাঝেও লেগেছে। ভোর বেলায় ফুটফুটে ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে স্কুলে যায়। নেচেগেয়ে মাতিয়ে রাখে স্কুল প্রাঙ্গণ। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নয়, সচেতন নাগরিক হিসেবে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে।



বাংলাদেশের দুটি কালচারাল একাডেমির একটি বিরিশিরিতে অবস্থিত। সুসং রাজার রাজবাড়ী, কমলা রানীর দীঘি, রানীখং পাহাড়ে ১৯১২ সালে সর্ব প্রথম প্রতিষ্ঠিত ক্যাথলিক গীর্জা ও টংক আন্দোলনের নারী নেত্রী হাজংমাতা রাশিমনির স্মৃতিসৌধ এ অঞ্চলে অবস্থিত।
টিলা পাহাড়ের ঝরনা ছাড়া এখানকার প্রাণদানকারী একমাত্র পাহাড়ি নদী সুমেশ্বরী। এর দুপাশে সিলিকা বালুসমৃদ্ধ বিশাল চর, যা কিনা কাচ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। বালুচরে একদল মানুষ খোঁড়াখোঁড়ির কাজে ব্যস্ত। যারা বালুরাশির নিচ থেকে খুঁড়ে বের করছে কাঠ-পাথুরে কয়লা। এগুলোর ক্ষুদ্র আয়েই ওদের জীবিকা নির্বাহ। নদীর স্রোতে ভেসে যায় পাহাড়ি বড় বড় গাছ। কেউবা জাল ফেলে মাছ ধরে খরস্রোতা সুমেশ্বরীতে। সুবিস্তৃত মাঠে বাদাম, তরমুজ, মিষ্টি কুমড়ার চাষ। নারী-পুরুষ-শিশু কাজ করছে কাঠফাটা রোদে। বৈচিত্র্যে ভরা ওদের জীবন। দুর্গাপুরের অদূরেই বিজয়পুর। টিলা পাহাড়ে সমান ঘনবসতি। তবে এখানকার সবুজ টিলা পাহাড়গুলোর মাটি সাদা। শ্বেত মৃত্তিকা হিসেবে আমরা যাকে চিনি। দেশের সিরামিকস শিল্পের প্রধান উপাদান চীনামাটি, টাইলস ও বৈদ্যুতিক তারের ইন্সুলেশন ওয়ারের ব্যবহত কাঁচামাল সাদামাটির এ পাহাড়গুলো। বিভিন্ন সিরামক কোম্পানি লিজ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে এগুলোর বুক চিরে বের করে আনছে অমূল্য সম্পদ যা থেকে তৈরি জিনিস দেশে-বিদেশে বিপুল চাহিদার দাবিদার।
সিনেমার সুটিং স্পট ছাড়াও দেশের বিভিন্ন পর্যটন কোম্পানি এগিয়ে এলে দুর্গাপুরে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠতে পারত। আর তাতে এ অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান হতো উন্নত। পাশাপাশি জেলার অর্থনীতির সমৃদ্ধতা ও সরকারি রাজস্বের আয় বৃদ্ধি পেত। যে যাই বলুক, আজই দলটাকে ভারি করে বেরিয়ে পড়ন। মাত্র তিন দিনের ট্যুর। খরচপাতিও সীমিত। অরণ্যের আবহে বণ্যপ্রাণী আর পাহাড়ের সমাবেশ ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে বড়ই প্রিয়। যার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মন আনন্দে নেচে ওঠে। উপজাতিদের গ্রাম ভ্রমণ, পাহাড়ের সঙ্গে সখ্যতা শুধু এরকম নির্মল প্রকৃতির রাজ্যেই সম্ভব।
বিদেশ ভ্রমণে অজস্র টাকা খরচ না করে অল্প পয়সায়, স্বল্প সময়ে দেশটাকে আগে চিনুন, জানুন, দেখুন। যে কথা রূপসী বাংলার কবি বলে গেছেন তেমরা যেখানে সাধ চলে যাও, আমি এই বাংলার পাড়ে রয়ে যাবো।
 
যেভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন
মহাখালী থেকে সরাসরি বাস যায় বিরিশিরি- সুসং দুর্গাপুর। ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ টাকা। এছাড়া প্যাকেজ প্রোগ্রামে সরাসরি গাড়ি নিয়েও যেতে পারেন। দুর্গাপুরে অনেক আবাসিক হোটেল আছে যেগুলোর ভাড়া প্রতিদিন ২০০-৩০০ টাকা এবং সেবার মান উন্নত।




সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology