ইউ.এস.এ

বার্ক লেকে ক্যাম্পিং

প্রকাশ : 31 আগস্ট 2014, রবিবার, সময় : 06:18, পঠিত 1614 বার

মঈনুস সুলতান
জঙ্গলে ঝড়ে উপড়ে পড়া মস্ত এক গাছের ওপর বসে ওয়াকম্যানে মোৎসার্টের সিডি ঢোকাই। গাছটির কোথাও কোথাও বাকল খসে এসেছে, ওখানে হাঁটছে প্রচুর পিঁপড়া। আলগা হয়ে আসা ধূসর ছালের নিচে ধবধবে সাদা সব কীট খুব মগ্ন হয়ে কিছু করছে। এখানকার নির্জনতায় বসে খুব অশান্তি লাগে।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই হাইকিং শুরুর আগে ইফফতকে টেলিফোন করা কি সঠিক হলো? আমার মুডে এখন স্পষ্টত তার সঙ্গে আলাপের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। কাল রাতে ঘুমও তেমন একটা ভালো হয়নি। আমি তাঁবু হিসেবে এ যাত্রায় রাত কাটানোর জন্য যে বস্তুটি কিনেছি, তা দামে ছিল সস্তা, কিন্তু ব্যবহারে মোটেই টেকসই নয়। জিনিসটি কেবল একজন নিঃসঙ্গ হাইকারের ব্যবহারের উপযোগী। ভেতরে কফিনের মতো চেন লাগানো স্লিপিং ব্যাগে শোয়ার বন্দোবস্ত আছে। মুখের দিকে ট্যান্সপারেন্ট প্লাস্টিকে একটু জালি দিয়ে বাতাস ঢোকার এবং মশা ও কীটপতঙ্গ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থাও আছে। এতে ঢুকতে হয় হামাগুড়ি দিয়ে। ভেতরে কিছু রাখার মতো স্পেস নেই। রোল করে খুব হালকা এ তাঁবু ব্যাকপ্যাকের সঙ্গে ক্যারি করা যায় খুব সহজে। তবে স্লিপিং ব্যাগের ফোমের পেডিং এতই পাতলা যে, সারারাত আমি শীতে কেঁপেছি, তার ওপর অসমতল মাটিতে গাছের শিকড়-বাকড় ও নুড়ি পাথরের জন্য পিঠেও ব্যথা হয়েছে।
বার্ক লেকে আজ আমি হাইকিং শুরু করব। এর আগে কখনো একা ওভার নাইট হাইকিং করিনি। ইফফতের বিষয়টি এখন চাইলেই ঝরাপাতার মতো মন থেকে মুছে ফেলা যাচ্ছে না। যদিও সে আমার অফিসিয়ালি গার্লফ্রেন্ড না, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে সহপাঠী হিসেবে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা খুবই গাঢ়। মেয়েটির পিতা পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আগত পাঠান অভিবাসী। ইফফতের মা রোমানিয়ান মহিলা। তার মা-বাবার ভেতর বছরখানেক হয় ডিভোর্স হয়েছে।
আজ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই ইফফতকে টেলিফোন আমি করেছি নেহাত সৌজন্যবশত। রিং করার জন্য পরোক্ষভাবে অনুরোধ করে সে আমাকে কিছু কয়েন দিয়েছে। এখান থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে আছে রিজার্ভ পার্কের রেঞ্জারের স্টেশন। ওখানে আছে হাইকার তাঁবু খাটানো ক্যাম্পপারদের গোছল ও খাবার পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা। ইমার্জেন্সি হলে স্টেশনের দেয়ালে ঝোলানো পে-ফোন থেকে টেলিফোনও করা যায়। হাইকিং করে আরো ভেতরের দিকে চলে গেলে এ সুযোগ হারাব। তাই, সকালবেলা বোতল ভরে খাবার পানি আনতে গিয়ে আমি তাকে রিং করি। তার কাছ থেকে যা শুনেছি তা ঠিক আবর্জনার মতো ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া যাচ্ছে না, তাই বিষয়টি মনে মনে খতিয়ে দেখে তথ্যগুলো প্রসেস করি।
কিছু বিষয় এখন আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে আসছে। কথা ছিল ইফফত আমার গাড়িতে লিফট নিয়ে নিউইয়র্ক অব্দি আসবে। তারপর তাকে তার মায়ের বাসায় নামিয়ে দিয়ে আমি ভার্জিনিয়ার দিকে মেলা দেব নির্জনে হাইক করার জন্য। কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত আসেনি। এখন টেলিফোনে কথা বলে যা জানা গেল তা হচ্ছে- মার সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ইফফতের মা তার ইকোলজিস্ট বয়ফ্রেন্ড মি. হেডোকের সঙ্গে জোড়ে লিভ টুগেদার করছেন। সুতরাং মায়ের অ্যাপার্টমেন্টে ইফফতের দু-এক রাত কাটানোর প্রশ্নই ওঠে না।
এদিকে তার বাবা মালিক ইয়ার ইফফতকে দেখতে এসেছেন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে। তিনি এবার একা আসেননি। তার সঙ্গে এসেছে শাহরিয়ার সিকান্দর বলে এক পাঠান তরুণও। তারা দুজনে হোটেলে থাকছেন। শাহরিয়ার সিকান্দারের গ্রোসারির দোকান ও হালাল গোশতের রমরমা ব্যবসা আছে। সে অবসরে ট্যাক্সিও চালায়। ইফফতের ইউনিভার্সিটিতে পড়ার গেল কয়েক সেমিস্টারের খরচ তার বাবা জুগিয়েছেন মূলত শাহরিয়ারের কাছ থেকে ধার করে। বিষয়টি ব্রাইড প্রাইসের মতো। ইফফত যদি শাহরিয়ারকে বিয়ে করে তাহলে মালিক ইয়ার সাহেবকে দেনা শোধ করতে হয় না। ইফফত এক ধরনের আতঙ্ক ও টেনশনের মধ্যে আছে, টেলিফোনে সে একটু কেঁদেছেও। সঙ্গে সঙ্গে এও বলেছে, ছেলে হিসেবে শাহরিয়ারকে তার খারাপ লাগেনি। গ্রিক দেবতার মতো দেখতে লম্বা চওড়া শার্প গড়নের কার্টিয়াস মানুষ সে। তার দাবি খুবই সামান্য- ইসলামিক কায়দায় বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ইফফতকে মাত্র দিন বিশেকের জন্য পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশের মনসেরা জেলাতে যেতে হবে। ওখানে খুব রক্ষণশীলভাবে পর্দা করার কোনো প্রয়োজন নেই। ওড়নায় মুখ আর বুক ঢাকলেই চলবে। তারপর ফিরে এসে ইউনিভার্সিটিতে পুরা মাস্টার্স পড়ার খরচ শাহরিয়ার জোগাবে। ছেলেটি এতই অমায়িক যে, বার দুয়েক তার সঙ্গে হিন্দুস্থানি রেস্তোরাঁয় বসলেও কখনো সে তার হাত স্পর্শ করেনি। বিয়েটা হবে মূলত ট্রায়েল রান হিসেবে। পরিষ্কার কথা হয়েছে- বনিবনা না হলে আমেরিকাতে ফিরে ইফফত তাকে ডিভোর্স দিয়ে দেবে। ডিভোর্স হলেও শাহরিয়ার কিন্তু তার বাবাকে দেয়া টাকা-পয়সা ফেরত চাইবে না।

পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশের একটি প্রান্তিক গ্রামে যাওয়ার ব্যাপারে মনে হয় ইফফতের একটু আগ্রহও জন্মেছে। সে আমার কাছে জানতে চায়- দিন বিশেকের জন্য ইসলামী অনুশাসন পালন করা কি খুব চ্যালেঞ্জিং হবে? শাহরিয়ারের পরিবারের মেয়েরা তো এক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করবে। নাটকে যেরকম নায়িকারা চরিত্রাভিনয়ের জন্য ড্রেস পাল্টায় বা শিখে নেয় ভিন্ন সংস্কৃতির আচার-আচরণ, সে কি পারবে না দিন বিশেকের জন্য ইসলামিক কেতার এক তরুণীর পাঠে অভিনয় করতে? তার লেখাপাড়ার ব্যয়ের কারণে তার বাবা আজ ঋণগ্রস্ত, মেয়ে হিসেবে স্নেহশীল পিতাকে সে তো একটু রিলিফ দিতে পারে? আমি বিরক্ত হয়ে তাকে বলি- ইফফত, ইউ আর টকিং অ্যাবাউট লাইফ, দিজ ইজ নট ড্রামা যে, তুমি মঞ্চে রোল-প্লে করতে যাচ্ছো। পাকিস্তানে যাওয়া তোমার জন্য খুবই রিস্কি। টেল মি হোয়াট আর দ্যা রিস্কস- সে জানতে চাইলে আমি বলি, বিয়ের পর তুমি সেক্সুয়ালি অ্যাবিউস হতে পার। কিন্তু তখন তো সেক্স হবে কনসেনস্যুয়ালি, বলে ইফফত কাউন্টার পয়েন্ট উত্থাপন করে। তাতে আমি রিয়েক্ট করি- অলরাইট, গ্রাম্য একটি পাঠান পরিবারের সঙ্গে তোমার কালচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট নাও হতে পারে। তুমি বেড়ে উঠেছো রোমানিয়ান কেতায় তোমার মায়ের প্রভাবে। তোমার বাবা পাঠানদের আদব-কায়দা বা ইসলামের অনুশাসন কিছু তোমাকে শেখাননি। সো আই রেকন, ইউ ইউল হ্যাভ কালচারাল কনফ্লিক্ট। সে পাল্টা যুক্তি দেয়- কিন্তু আমি তো আমেরিকাতে ফিরে আসছি দিন বিশেক পর। আমি এবার বলি- তারা যদি তোমাকে ফিরতে না দেয়? আমার আশঙ্কায় কনভিন্স না হয়ে সে বলে- ফিরতে দেবে না কেন? ডিল ইজ দ্যাট. বিশ দিন পর আমি ফিরে এসে ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স প্রোগ্রামে অ্যাপ্লাই করব। শাহরিয়ার ইজ গোয়িং টু পে ফর দি হৌল মাস্টার্স বিজনেস। আমি এবার তাকে অনুরোধ করি- প্লিজ থিংক টুয়াইস্ ইফফত বিফোর এগ্রি টু মেরি শাহরিয়ার। সে বিরক্ত হয়ে বলে- ওয়েল, দিস ইজ লেইট, কালকে আমি তার সঙ্গে নিউইয়র্ক যাচ্ছি পাকিস্তানি ভিসা নেয়ার জন্য। আমি একটু অধৈর্য হয়ে বলি, ইফ ইউ ওয়ান্ট মাই অনেস্ট ওপিনিওন, ইউ আর টেকিং এ স্টুপিড রিস্ক। ঝুঁকিটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।
ইফফতের মনে হয় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেছে। সে যেন আমার সঙ্গে তর্ক করছে এ রকম ভাবে বলে- ইসলামাবাদের আমেরিকান এম্বাসির টেলিফোন নম্বর আমার কাছে আছে। নওশেরাতে শাহরিয়ারের পরিবারের সঙ্গে আমার যদি অ্যাডজাস্ট না হয়, আমি যদি এবিউসের শিকার হই, আই উইল জাস্ট কল আমেরিকান এম্বাসি, আই অ্যাম এ স্মার্ট আমেরিকান গার্ল। আমার কথাবার্তায় কাজ হচ্ছে না দেখে আমি ম্রিয়মাণ হয়ে মিনমিনিয়ে বলি- নওশেরার গ্রামে টেলিফোনের লাইন আছে কিনা কে জানে, আর শাহরিয়ারের ফ্যামিলি তোমাকে শহরে গিয়ে এম্বাসিকে ফোন করা অ্যালাউ না করতেও পারে। টেলিফোনে কিছুক্ষণ মৌণ থেকে খুব ঠন্ডা মাথায় ইফফত বলে, -আই এলওয়েজ থট ইউ আর এ্যা গুড ফ্রেন্ড, আমি ভিন্ন একটি দেশে যাচ্ছি, ইসলামী কালচার বিষয়টা তুমি ভালো বুঝ, তাই এক্সপেক্ট করেছিলাম তুমি একটু অ্যাডভাইস করবে। নাউ আই সি ইউ আর... সে নীরব হয়ে গেলে আমি জানতে চাই- ইউ আর হোয়াট? পুকুরের জলে কিছু অচল ভাংতি পয়সা ছুড়ে ফেলার মতো তোড়ে সে বলে- ইউ আর জেলাস, ডেড্ জেলাস, সুপার জেলাস। একটি অত্যন্ত হ্যান্ডসাম ছেলে, খুব জেনারাস হয়ে দরাজ হাতে আমার বাবাকে হেল্প করছে, হি ইজ ভেরি নাইস অ্যান্ড কাইন্ড টু মি... ইউ ডোন্ট লাইক দিস। আমি বিরক্ত হয়ে লাইন কেটে দেই।
আলাপের প্রথমদিকে ইফফতকে খুব দ্বিধাগ্রস্ত শোনাচ্ছিল। রিস্কের ব্যাপারটা সে যে একেবারে বুঝতে পারছে না তাও নয়। এ টেনশন থেকে সে একটু কাঁদলও। তারপর আমার মন্তব্যে ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে উঠল। তাকে আমি যতটা জানি- সিদ্ধান্ত যখন সে নিতে পারে না, তখন আমার সঙ্গে ঝগড়া বাধানোর একটি প্রবণতা তার আছে।
এ দেশে বড় হওয়া পাঞ্জাবি পাঠান মেয়েরা তাদের দেশি মরদকে বিয়ে করে পাকিস্তান ফেরার পর নানাভাবে এবিউস হয়েছে। ঠিকমতো নামাজ-কালাম করতে না পারার জন্য তাদের মোল্লারা দোররা দিয়ে পিটিয়েছে। বোরকা পরতে অস্বীকার করার কারণে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা একটি পাঠান-আমেরিকান মেয়েকে চেপে ধরে তার গায়ে গরম লোহা দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়ে দেয়। টর্চার করে তাদের কাউকে কাউকে পেশোয়ারের ব্রথেলে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে পত্র-পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, বইপত্র লেখা হয়েছে; ইফফত চাইলে তা পড়ে দেখতে পারে। আমি এমন কিছু অহেতুক মন্তব্য করিনি। তার বিষয় ভেবে আমার হাইকিং আজ মাটি করার প্রশ্নই ওঠে না। সেও আমার কাছে এ মুহূর্তে অচল পয়সার মতো, আমি তা কাল্পনিকভাবে ছুড়ে ফেলি ঝরাপাতার স্তূপে।
তারপর মনকে শান্ত করার জন্য আমি ওয়াকম্যানে সিডি অন করি। মোৎসার্টের পিয়ানো কনসার্টের সতেরো নম্বরে অলেগ্রো পিসটি বেজে ওঠে। মনে হয় বাদক সংগীতের খাতায় রিড টেপার পেন্সিল দিয়ে ঝংকারের স্কেচ আঁকছেন। আমার সামনে বেশ কিছু ব্ল্যাকবেরির ঝোপ। তাতে পাঁচ-সাতটি ছোট ছোট নীড়। হলুদ বুকের মা রবিন পাখি ব্ল্যাকবেরির গোটা ঠোঁটে নিয়ে বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছে। পিয়ানো বাদনে পাথরের ওপর দিয়ে প্রস্রবণের জল গড়িয়ে যাওয়ার মতো ধ্বনি হলে উঠে পড়ি।
ওয়াকম্যানে আলেগ্রো শুনতে শুনতে অলস ভঙ্গিতে বড় বড় গাছের ভেতর দিয়ে পাড়ি দেই আধ জংলা ঝোপঝাড়। পত্রপল্লবে সিগ্ধ পথে পয়ে-চলা ট্রেইল ধরে খানিক সামনে আগালে বনানী একটু গভীর হয়ে আসে। ঝোপঝাড়ের আন্ডারগ্রোথে গলা ফুলিয়ে কলকল করে ওঠে ওয়াইল্ড টার্কি। কান থেকে ইয়ার ফোন খুলে আমি খানিকটা সময় ঝকঝকে রোদে গাছের ডালে শব্দ করা পতঙ্গের ধ্বণি শুনি। ঝরা পাতায় ছাওয়া অন্য একটি ট্রেইলে আসতেই সবুজ ঘাসের ক্লিয়ারিংয়ের ভেতর দিয়ে হ্রদের পাথরে বাঁধানো রূপালি রেখা দেখা যায়। আমি ট্রেইল ছেড়ে আন্ডারগ্রোথের নরম শাখা-প্রশাখা দুদিকে সরিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে চলে আসি পানির কিনারে। এখানে যেন সবুজ পাড়ের সঙ্গে তীব্র কনট্রাস্ট কালারের বেশ কখনো রূপালি জমিনের বালুচরি শাড়ি আঁকাবাঁকা করে ফেলে রাখা হয়েছে। অগভীর পানিতে পা ডুবিয়ে বসে একটি বাচ্চা গ্রিন-হিরণ পাখি ঠোঁট ফাঁক করে আমার কাছে খাবার চায়। শাবকটির পালক হালকা নীলাভ রঙের, এখনো তা সবুজে বিবর্তিত হয়নি।
আমি ওখানে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে জলের প্রান্ত স্ক্যান করি। বেশ দূরে সাঁতার কাটা এক যুগলকে দেখা যায় আবছাভাবে। আমি তাদের স্ট্যাডি করি। নো, সি ইজ নট ওয়ান অব দেম। তাকে আরেকটু খুঁজলে খারাপ হয় না। গেলরাতে ড্রাইভ করে ভার্জিনিয়ায় আসার পথে এক পানশালায় তার সঙ্গে দেখা হয়। কম্বোডিয়া থেকে আগত এ অভিবাসী মেয়ের নাম চম্পো। আজ এ হ্রদে তারও আসার কথা আছে। তার বিষয়-আশয় চিন্তা করতে করতে ইফফত বিষয়ক ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার একটি আউটলেট পেয়ে খুশি হই। খানিক কসরতে জলের দিকে নেমে আসা গাছের ডালে চড়ে বাইনোকুলারে এদিক-ওদিক তাকাই। হৃদের পাড়ের বনানীকে তেমন একটা ঘন মনে হয় না। আরেকটি ট্রেইলে অন্য এক হাইকারকে হনহন করে হেঁটে যেতে দেখি। মনে হয় জলের প্রান্ত ঘেঁষে হাইক করলে তাকে ডিটেক্ট করা যেতেও পারে?
দিস ইজ স্কেরি! যিশাস ক্রাইস্ট!- বলে কেউ আর্তনাদ করে উঠলে আমি গাছের ডাল থেকে নেমে পড়ে বিষয়টি কী তা বোঝার চেষ্টা করি। দিস ইজ ক্রিপি, ইট শুড নট বি হিয়ার- বলে আরেকবার কঁকিয়ে উঠলে গলার স্বর খেয়াল করে আমি ওই দিকে আগাই। বেশি দূর যেতে হয় না আমাকে। ঝোপঝাড় ছত্রখান করে- ছোট ছোট পাখি, প্রজাপতি ও ফড়িংদের উড়িয়ে দিয়ে এক হাইকার তরুণী দৌড়ে এসে আমার সামনে মাটিতে বসে পড়ে বলেন-সামওয়ান প্লিজ হেল্প মি। আমি মহিলাকে ওয়াটার বটল এগিয়ে দিয়ে বলি- ঘটনা কি কাইন্ডি এক্সপ্লেইন করুন, দরকার হলে আমি মাইল দুয়েক দৌড়ে গিয়ে রেঞ্জারকে ডেকে আনব। নো, নো ডোন্ট গো এনি হোয়ার, বলে তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন, দেয়ার ইজ এ্য স্কেলিটন, এ রিয়েল ওয়ান। কংকালটি পড়ে আছে একদম পানির কিনার ঘেঁষে।
ফিশিং জ্যাকেট পরা এ তরুণীকে দেখে খুবই সিজনড হাইকার মনে হয়। এখানে বনানী একেবারেই গভীর না। এ সব ট্রেইল হামেশা ফরেস্টের লোকজন মেন্টেইন করে থাকে। এদিকে কংকাল আসে কীভাবে? আমি একটু সামনে গিয়ে কংকালটি দেখতে চাই, কিন্তু তিনি কিছুতেই তাকে একা ফেলে আমাকে আগ বাড়তে দেন না। এখানে পয়পরিষ্কার হাইকিং ট্রেইল আরো আছে। আমি অন্য একটি হালকা গাছপালায় ছায়াময় ট্রেইলে তাকে এসকর্ট করে নিয়ে যাওয়ার কথা বলি। কিন্তু সমস্যা হয়- লেকে কায়াক জাতীয় হালকা নাও ভাসানোর সময় তিনি কংকাল দেখে নৌকা ওখানেই ফেলে এসেছেন, বোটটি উদ্ধার করা দরকার। তাই তাকে আমি আমার ওয়াকম্যান দিয়ে একটু মোৎসার্টের পিয়ানো কনসার্ট শুনতে বলি। তিনি তা কানে লাগিয়ে আনদানতে বলে একটি পিস শুনতে শুনতে খানিক শান্ত হলে আমি সামনে এগিয়ে যাই কায়াক-নাও খুঁজতে।
তার আতঙ্ক অহেতুক না। নৌকার পাশেই ঘাসে খানিক পুঁতে থাকা কংকালের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। মেরুদন্ডের দু-পাশে পাঁজরের সাদা হাড়গুলো নিড়ানির মতো আঁকড়ে ধরেছে দুপাশের মাটি।  মুণ্ডুতে মাংস না থাকার ফলে সঠিকভাবে বলা মুশকিল কিসের কংকাল এটি। আমি নাড়াচাড়া করে হাড়ে গড়া দুটি পায়ের আকার দেখতে পাই। তাতে খুর না দেখে আমিও এবার আঁতকে উঠি। পরে ভাবি- কংকালটি নির্ঘাত কোনো জন্তুরই হবে, অন্য দুটি পা ও খুরগুলো হয়তো কোনো জানওয়ার খেয়ে নিয়েছে। নৌকাটি টেনে এনে দেখি ভয় পাওয়া তরুণী তার রোদচশমা শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরে ওয়াকম্যানে মোৎসার্ট শুনছেন।
আমি তাকে ইশারায় ঘুরে তাকাতে বলি। ঘন ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে একটি মা হরিণী দুটি চিত্রল বাচ্চা নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তরুণী চোখ মুছলে আমি তাকে বলি, ডোন্ট ওয়ারি, কংকালটি অফকোর্স কোনো হরিণেরই হবে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে তা মেনে নেন। নৌকাটি টেনে হেঁছড়ে আরো কিছু দূর নিয়ে যেতে আমি তাকে সাহায্য করি। পাড়ে ঘাসের বর্ডার দেয়া অন্য এক এলাকা থেকে জলে নাও ভাসাতে গিয়ে দেখি তার চোখেমুখে ফিরে এসেছে রক্ত। তিনি খুব কনফিডেন্টলি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে হলুদ বৈঠায় জল কেটে লেকে ভাসেন।
আমি জলের পাড় ঘেঁষে বয়ে চলা একটি ট্রেইল ধরে হাঁটি। মহিলাকে সাহায্য করার একটা সুযোগ এসে যাওয়াতে একই সঙ্গে দূর হয়ে যায় নিঃসঙ্গতা ও ভোরবেলাকার অশান্ত মুড। সিডিতে আমি মোৎসার্টের পিয়ানো কনসার্টের একুশ নম্বর পিস বাজিয়ে হাঁটি। বাদন অনদানতে ভিভোর কাছাকাছি আসতেই মন যেন তেপান্তরের সন্ধান পেয়ে হয়ে ওঠে উদাসীন। ঝংকারের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে সকালবেলা যাকে নিয়ে চিন্তিত ছিলাম এবং মনে আর যে সব মানুষের উপস্থিতি ছিল; সব যেন নোনাজলের তোড়ে ধুয়েমুছে চেতনায় কেবলমাত্র বনানী, দীঘল বৃক্ষ ও মৃদু বাতাসে ভেসে আসা এ মুহূর্তে অদৃশ্য কোন ফুলের সৌরভ প্রধান হয়ে ওঠে।
মাইল দুয়েক হেঁটে আমি আবার জলের কিনারে আসি। হ্রদের এদিকে শতশত চেরী গাছে পুষ্পিত হয়ে জ্বলছে রূপার রেকাবিতে পাপড়ির গোলাপি পিদিম। লেকের জল খুবই পরিষ্কার, তাতে গাছের কাটা গুঁড়ির পাশে সাঁতরাচ্ছে মাছ, দূরে সরোবরের ভেতরবাগে ভাসছে একটি গোলাকার দ্বীপ। এ প্রিস্টিন আবহের ভেতর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমি পানির সারফেসে হেঁটে চলা জলপোকাদের তৎপরতা দেখি।

কিছুক্ষণের ভেতর অন্য এক ধরনের অস্থিরতা ফিরে আসে মনে। আমি আবার আগ বাড়ি। এ দিকে জলচর পাখিদের প্যাকপ্যাকের ভেতর মিশে আছে ঝরা পাতা ডিকম্পোজ হাওয়ার বনাজি গন্ধ। আর ডগ-উডের গাছগুলোর পত্রালি রঙিন হয়ে নিসর্গের শোকেসে জুড়েছে বর্ণাঢ্য মাত্রা। আমি সামনের দ্বীপের দিকে তাকাই। আর যেন ফিল করি- চম্পে, সি ইজ হিয়ার। কিন্তু কোথায়? অস্থির হয়ে বাইনোকুলারে পাড়ের ক্লিয়ারিং স্ক্যান করি। লেইক বার্ক সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। গেলরাতে ভার্জিনিয়ার দিকে ড্রাইভ করে আসার পথে ডিসকো কনসার্টে ভরপুর পানশালায় রাত কাটাতে হয় গাড়ি বিকল হলে পর চম্পোর সঙ্গে দেখা হয় হট-টাবের পাশে। তার কাছ থেকেই এ হ্রদ ও বনানীর জাদুময়তা সম্পর্কে কাল রাতে প্রথম শুনি। সেই আমাকে এখানে আসার জন্য রিকমেন্ড করেছে। অভিয়াসলি তারও আজ এখানে আসার কথা আছে। আমি বাইনোকুলার দিয়ে সব কিছু খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে ঝোপঝাড় মাড়িয়ে সামনে বাড়ি।
বাইনোকুলারে কংকাল দেখে আঁতকে ওঠা তরুণীকে স্পট করি। মিনিট কয়েকের ভেতর তিনি কায়াক ভাসিয়ে পাড়ে চলে এসে জানতে চান- আর ইউ লুকিং ফর মি? আমি জবাব দেই- নট রিয়েলি। কিন্তু বারবার তোমার বাইনোকুলারের কাচে সানলাইট রিফলেক্ট করছিল বলে তিনি পাড়ে উঠে বলেন, উড ইউ বি ইন্টারেস্টেড টু বার্টার সামথিং? হাইকারদের মাঝে চলার পথে বার্টার বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, খাবার দাবার, পানীয় জল বা স্যুভেনির, স্মারক ইত্যাদি বিনিময় করার প্রথা আছে। আমার ব্যাকপ্যাকে বার্টারের জন্য কিছু সওদাপাতি আছেও। কিন্তু এ মুহূর্তে ব্যাকপ্যাক যে তাঁবুতে ফেলে এসেছি।
আমি তার দিকে তাকালে ব্যক্তিত্বের তীব্র বিকিরণ করে তিনি বলেন, লিসেন, কংকাল দেখে... অল মাই ফেদার্স বিকেইম টোটালি রাফোলড্। ম্যান ও ম্যান, এ্য রিয়েল স্কেলিটন। তিনি ঝড়ে পালক এলোমেলো হয়ে যাওয়া পাখির অঙ্গভঙ্গি করে বলেন, ইউ রিয়েলি হ্যাভ সাম কুল মিউজিক ম্যান। তুমি বার্টার করতে চাইলে আমি এখানে রোদে শুয়ে মোৎসার্টের সিডি পুরাটা শুনবো। বিনিময়ে তুমি আমার কায়াক ভাসিয়ে সরোবরে ঘুরে বেড়াবে- হাউ অ্যাবাউট দিস? সংগীত শুনতে দেয়ার বিনিময়ে কায়াকে চড়ে নাও ভাসানো... করবে বিনিময় আমার সঙ্গে? আমি ওয়াকম্যান তার হাতে দিয়ে বলি, কতক্ষণ নৌকা ব্যবহার করতে পারি? তিনি কোনো চিন্তাভাবনা না করে জানান, ডোন্ট ওয়ারি অ্যাবাউট টাইম, আমরা বনানীতে এসেছি, এত সময় সচেতন হয়ে হবে কী?.. দুই-আড়াই ঘণ্টা, অল ফাইন। আমি একটু সিডি বাজিয়ে শুয়ে রিলাক্স করে দেখি- মন থেকে কংকালের ইমেজ সরাতে পারি কিনা?

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology