মৌলভীবাজার

নিরালা পুঞ্জিতে এক বিকেল

প্রকাশ : 31 আগস্ট 2014, রবিবার, সময় : 06:29, পঠিত 2125 বার

জাকিয়া নাজনীন
অনেক দিন থেকেই আমার পুঞ্জিতে বেড়ানোর শখ। এর আগেও একটা খাসিয়া পুঞ্জি দেখেছি; ফিনলে চা বাগনের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সেটি, নাম তার নাহার পুঞ্জি। ছোটবেলা থেকেই নিজের দেশকে দেখার আগ্রহটা তৈরি করে দিয়েছিলেন বাবা। বাবার সাথে দেশের নানা জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছি ও দেখেছি নতুন নতুন সব যায়গা, সঞ্চয় করেছি অসামান্য কিছু অভিজ্ঞতা। বিয়ের পরও সেই ভাগ্যটা সুপ্রসন্নই আছে। অনেক দিন থেকেই এই পুঞ্জিতে যাবার কথা হচ্ছিলো। এবার দেখেই এলাম। ফিনলে চা বাগানের পুর্বদক্ষিণে অবস্থিত এই নিরালা পুঞ্জি । এখানে আরও একটি খাসিয়া পুঞ্জি আছে যার নাম চইলতা পুঞ্জি। পড়ন্ত বেলার রূপের নানা রং দেখতে দেখতে পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে এগিয়ে চললাম। যে কোন নতুন সৌন্দর্য অবলোকনের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য কিছুটা বন্ধুর পথ তো পেরুতেই হয়। তবে সেই বন্ধুর পাহাড়ি রাস্তা পার হতে অসাধারণ লাগছিল।
পাহাড়ের উপর থেকে নুয়ে পড়া সূর্যের ছটায় রাঙা আকাশ আর নিচে সবুজ বন, দুইই চোখ মেলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে আগ্রহী করে তুলছিল। কখনো ছিল পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে উপরে উঠা, আবার কখনোবা নিচের দিকে নামা। বলা যায় আরোহন-অবরোহন। আঁকাবাঁকা পথের ধারে পাহাড়ের গায়ে দেখলাম দুর্গার মূর্তি বসান। বাগানের চা শ্রমিকরা রাতে শ্বাপদ সঙ্কুল পথে চলাচল করে বলে তারা বিশ্বাস করে মা বনদুর্গা তাদের সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা করেন।
পাহাড়ি ঢালু রাস্তায় মাঝে মাঝেই গাড়ি থামিয়ে পাহাড়ের গায়ে জড়িয়ে থাকা সবুজ বনানী আর সেইসাথে যোগ হওয়া গোধুলির রূপ ক্যামেরাবন্দি করতে যাত্রা বিরতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম পাহাড়ের গাঁ বেয়ে বেড়ে ওঠা লম্বা সরু সুপারি ও পাম গাছ গুলোতে বেড়ে উঠেছে খসিয়া পান গাছ। এটিই খাসিয়াদের প্রধান অর্থকরী ফসল। এখানে বরজ করে পান চাষ হয় না। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বনজ সম্পদকেই কাজে লাগিয়ে খাসিয়ারা গড়ে তুলেছে তাদের ব্যবসা আর জীবন ধারণের উপায়। আরও এক ধরনের লতান গাছ দৃষ্টি কাড়ল, অন্য গাছের উপর চারদিক ঘিরে বেয়ে উঠা গোল মরিচ গাছ । এক গাছের উপর আর এক গাছের বেড়ে উঠা যেন আমায় মনে করিয়ে দিল আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যেতে বসা একের উপর অন্যের নিঃস্বার্থ নির্ভরতার কথা। যত ভিতরে গেলাম তত অবাক হলাম!
দেখতে পেলাম প্রকৃতির যুদ্ধের সাথে সাথে সেখানে যোগ হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি, চোখে পড়লো সোলার প্যানেল-এর সাহায্যে বিদ্যুৎ সংগ্রহের ব্যাবস্থা। সারিবদ্ধ ছোট ছোট ছিমছাম কিছু কাচাপাকা ঘর। সান্ধ্য আলোতে বৈকালিক খেলায় মেতে আছে কয়েক জন যুবক ও বৃদ্ধ। ড্রামের উপর কেরাম বোর্ড রেখে খেলছে তারা। একটু দূর এগুতেই দেখলাম এক দল দুরন্ত খাসিয়া শিশু, ছেলেমেয়ে প্রত্যেকের হাতে একটি করে লাঠি। যে ভাবে তারা ধরেছিল লাঠিগুলি তাতে মনে হচ্ছিলো ক্ষুদে লাঠিয়াল বাহিনি। খুব ভাল করে খেয়াল করে দেখলাম প্রত্যেকের লাঠির আগায় দুটো করে চাকা লাগান। বুঝলাম এটি তাদের খেলার যন্ত্র। যন্ত্র এ কারণেই বলছি যে, ওগুলি ছিল ওদের খেলার গাড়ি। তবে পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতার জন্যই বোধ হয় ওদের খেলার ছলে হাতে লাঠি দিয়ে দেওয়া হয়, কারণ চা বাগানের পাহাড়ি রাস্তায় থাকে সাপের আনাগনা। প্রতিকূল পরিবেশে এ ভাবেই প্রতিকূলতার সাথে খাপ খাইয়ে বেড়ে উঠে সে এলাকার শিশুরা। শিশুদের থেকে চোখ ফেরাতেই খুব অবাক হয়ে দেখলাম, যে পাকা দালান টির সামনে শিশুরা খেলছে সেটি একটি গির্জা। সুদর্শন যিশুর মূর্তি ধারণ করা শোভন এক গির্জা। এখানকার অধিকাংশ বাসিন্দা খ্রিস্টান । পরে জানতে পারলাম এরা ক্যথলিক খ্রিস্টান । এমন সুন্দর গির্জা অনেক শহুরে এলাকাতেও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে! গির্জার উলটো দিকে একটি সুন্দর টি স্টল, পাহাড়ের ঢালে। দেখলেই বসতে ইচ্ছা হবে এমন পরিপাটি করে সাজান। গির্জার সামনে গাড়ি থেকে নামতেই শিশুগুলি একটু সরে দাঁড়াল, বুঝলাম ভয় পেয়েছে। ওদের ভয় ভাঙ্গাতে হবে। হাত বাড়িয়ে ডাকতেই দৌড়ে এল কাছে। বললাম, ছবি তুলবে, আস। সব দৌড়ে এল আমার গায়ের কাছে, সারল্যে ভরা দৃষ্টি ওদের। আর অবাকই হলাম, কে আমার গায়ের কত কাছে আর কে আমার কোলে বসবে এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল! শিশুরা চিরকালই আমার কাছে কাক্সিক্ষত, সে যে কোনো গোত্র, ধর্ম বা জাতিরই হোক না কেন। শিশুদের সান্নিধ্যে আমি এক অনাবিল আনন্দ অনুভব করি। ওদের সাথে মাখামাখিতেও এই অনাবিল অনান্দে মনটা ভেসে গেল। গাড়িতে উঠে হাত নাড়তেই সেই চিরচেনা বিশ্ব ভাষাটা বুঝে গেল। জোরে হাত নেড়ে একগাল হাসি দিয়ে চিৎকার করে বিদায় জানাল। আর একটু সামনে এগুতেই চোখে পড়ল বেশ সাজান বাগান ঘেরা একটি পাকা বাড়ি । বাড়ির সামনের বারান্দা টা আরো বেশি মনোযোগ কাড়ল । পরিপাটি করে সাজান সুন্দর বসার ব্যবস্থা, চা বাগানের বাংলোবাড়ি গুলির মতোই লাগছে দেখতে।
খাসিয়ারা খুব পরিচ্ছন্ন জাতি। আজকাল খাসিয়াপল্লীতেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। দেখলাম বাড়ির ছাদের উপর দুটি ডিশ এন্টেনা । এতটা পাহাড়ি বন্ধুর পথ পেরিয়ে এমন সুন্দর বাড়ি কল্পনাই করা যায় না! ড্রাইভার বলল এটাই ঝিনু মন্ত্রীর বাড়ি। এতদিন শুনতাম আর ভাবতাম সরকারি কোন মন্ত্রি এখানে কেন থাকে? এবার জানলাম আসল তথ্য, পুঞ্জি-প্রধানকে তারা মন্ত্রি বলে । এলাকায় ঝিনু মন্ত্রি নামেই তিনি পরিচিত। আসল নাম জিনুল আমিন। তার বাড়ির সামনেও দেখলাম আরো এক দল শিশু সেই লাঠি হাতে, তবে এরা আরো ছোটো বয়সের আর ওদের লাঠির আগায় কোন চাকা নেই। নিশ্চিত হলাম এটি তাদের প্রতিরক্ষা কৌশল । আশ্চর্য এক হিমেল হাওয়া ছুঁয়ে গেল মন-প্রাণ। শিশু দেখলেই ওদের জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা হয়, তাই আবার ছবি তুলতে গেলাম। শিশুদের সাথে আগন্তুকের এই মাখামাখি দেখে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসলেন একজন ভদ্রলোক । জানতে চাইলেন আমরা কারা? পরিচয় দিতেই সৌজন্যের সঙ্গে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলেন। কথা হোলো মন্ত্রির সাথে, ইনিই সেই ঝিনুমন্ত্রি। নিরালা পুঞ্জি প্রধান। প্রধান বলতে যে রাশভারি ব্যক্তির ছবি ভেসে উঠে মনে, তিনি তেমনটা নন। অত্যন্ত বিনয়ী এক সরল মনের মানুষ। অনেক কথা বললেন ,দেখে মনেই হয় না যে এত অর্থ সম্পদের মালিক! যে বন্ধুর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে এলাম, এটি তারই তৈরি করে দেওয়া, তার পুঞ্জির মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে। আপ্যায়ন করলেন গরুর খাঁটি দুধের তৈরী অসাধারণ স্বাদের চা আর মচমচে বিস্কিট দিয়ে। ঢাকার অনেক বাড়িতেই টেবিল ভরে নাস্তা দেবার পরও কোথায় যেন আন্তরিকতার অভাবটা থেকেই যায় । কিন্তু এ চায়ের সাথে কি এক নিবিড় আন্তরিকতা মিশে ছিল তা বলার নয়। মৃদুভাষি এই মানুষটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার আন্তরিকতায় আমাদের মুগ্ধ করে দিলেন। ঘুরে দেখলাম বাড়ির ভেতরটা। পাহাড়ের চুড়ায় তার বাড়ি আর নিচে দেখা যাচ্ছে সবুজ বনের এলানো সৌন্দর্য । বাড়ির এক পাশে জামাই বাড়ি। খাসিয়া দের রীতি অনুযায়ী বিয়ের পর জামাই এসে থাকে শ্বশুরবাড়িতে। আমাদের রীতির ঠিক উল্টোটা ।
সময় তো উড়ছে ! বিদায় ঘন্টা বাজল। রাতের আঁধার নামার আগেই উঁচু নিচু পাহাড়ি পথ পার হয়ে চা বাগানের সরু আঁকবাঁকা পথ ধরতে হবে। তার আন্তরিক বিদায়টাও মনে রাখার মত। ফেরার পথে চোখে পড়ল ঝুড়িতে বাধা পান, যা কিনা রাতে যাবে শ্রীমঙ্গল শহরে। সত্যিই অভিজ্ঞতার ভা-ারে যোগ হলো এই নিরালাপুঞ্জি ঘুরে দেখার মধুর এক নতুন পাতা ।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology