ভিয়েতনাম

হাজার বছরের পুরনো বিদ্যাপীঠ

প্রকাশ : 31 আগস্ট 2014, রবিবার, সময় : 07:57, পঠিত 1610 বার

মঈনুস সুলতান
ভিয়েতনামের হাল জমানার রাজধানী হ্যানয় শহরে এসেছি এশিয়ার কান্ট্রি ডিরেক্টারদের মিটিঙে সামিল হতে। কিন্তু মিটিং দীর্ঘস্থায়ী হলো না। আমাদের সভানেত্রী যাবেন উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসে কূটনৈতিক সহবৎ করতে। তাই সভা ভঙ্গ হলো বেলা আড়াইটা নাগাদ। কী আর করা। আমি আর হলেণ যুগলে বেরোই খানিকটা কারণ ছাড়া হাঁটাহাঁটি আর খানিকটা এলোমেলো শহর দেখতে। ফুটপাত ধরে বেশীদূর যাওয়া হয় না, পথ রোধ করে এসে দাঁড়ান ফোক্লা দাঁতে হাস্যমুখ এক আদম সন্তান। হ্যানয়ে এ অপরাহ্ন বেলায়ও ঠিক রোদের ঝাঁঝ মরেনি, তাই দন্তহীন অচেনা পথ-সাথী মাথায় পরেছেন মাথাইল, চোখে দিয়েছেন হলুদাভ বর্ণের রোদচশমা। আমরা দুজনে কেউই যেহেতু এক বর্ণ ভিয়েতনামী ভাষা বলতে পারি না তাই মাতৃভাষায় জিজ্ঞেস করি- কি সমাচার? জবাবে তার মুখমণ্ডলের খানাখন্দ উপচে উঠলো হাসিতে। খানিক ঝুঁকে আমাদের বুঝি স্বাগত জানালেন। ব্যক্তিটি ঠিক কী চান ভেবে বেশ ধন্দে পড়ে গেলাম। হলেণ আমার চেয়ে ঈষৎ চালাক। পথ চলতে খুঁটিনাটি এটা সেটা নজর করে দেখতে অভ্যস্ত। সে কানের কাছে মুখ এনে বলে,এ হচ্ছে সিক্লো ড্রাইভার। আমি তার অঙ্গুলি নির্দেশ অনুসরণ করে দেখি সত্যিইতো ফুটপাতের পাশে দাঁড় করানো রিকসার ভিয়েতনামি সংস্করণ সিক্লো। মধুর হাসির তাৎপর্য বুঝতে আর বিলম্ব হয় না। কিন্তু খানিক হাঁটাহাঁটি করতে বেরিয়েছি তাই সাথে সাথে সিক্লোতে চাপতে চাই না। তাতে করে পথ-সাথী সিক্লোওয়ালার হাসিটি মলিন হয় না এক বিন্দু। আমাদের সমান্তরালে তিনি মৃদু লয়ে ঠেলতে থাকেন সিক্লো নামের রিক্সাটি। হলেণের সাথে ফুটপাতে যুগলে হাঁটার প্রধান সমস্যা হচ্ছে- ও এক নাগাড়ে বেশীক্ষণ হাঁটবে না। মাঝে মধ্যেই দাঁড়িয়ে পড়ে এদিক ওদিক তাকাবে, দেখবে ফুটপাতের সওদাপাতি। কখনো সখনো রঙিন বেলুন বা রকমারী পণ্য ছুঁয়ে দেখবে তবে সহজে কিনবে না। এবার হলোও তাই, আচমকা সে দাঁড়িয়ে পড়ে এক ফলের দোকানের সামনে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আন্দাজ করি সাথি এ নারী খানিক আপেল, কলা ও লিচু ছুঁয়ে টুয়ে পথে ফিরে আসবে। কিন্তু অনুমানটি ফললো না। সে কেবলমাত্র ফল ছুঁঁয়েই ক্ষান্ত হলো না রীতিমতো কিনে বসলো ড্রাগন-ফ্রুট নামের উজ্জ্বল গোলাপি ও বেগুনিতে মেশা আজব গোছের একটি ফল। গাঁট থেকে কড়িটি আমাকে দিতে হলো। একটি দশ হাজার ডং এর নোট দিয়ে একটু অপেক্ষা করলাম। মুখরা ফলওয়ালি নিজ ভাষায় বেশ কিছু কথাবার্তা বললো, ফক্ ফক্ করে একটু হাসলো তবে ফেরত কিছু দিলো না। ফিরে আসছিলাম চলার পথে। সিক্লোওয়ালা এসে আমাদের থামালেন। তারপর চোখ থেকে হলুদ বর্ণের রোদচশমা খুলে নিয়ে ফলওয়ালির সাথে অবতীর্ণ হলেন বাকযুদ্ধে। আমরা তাদের সংলাপের বিন্দু বিসর্গ কিছু বুঝলাম না। তবে আলোচনা যে উত্তেজক তা আন্দাজ হলো তার হাতের নড়াচড়া দেখে। হ্যানয়ের বৈকালিক সূর্য তার রোদচশমায় প্রতিসরিত হয়ে ফল ও ফলওয়ালির গায়ে আলপনা কাটছে। মহিলা অবশেষে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে আমাদের ফিরিয়ে দিলেন পাঁচ সহস্র ডং বা ভিয়েতনামী টাকার একটি নোট। আমরা হাঁটতে গিয়ে ঈষৎ দোলাচলে পড়লাম, হেঁটে যাবো -নাকি যিনি অযাচিত ভাবে আমাদের পাওনা উদ্ধার করে দিলেন তার বাহনে সওয়ার হবো?

হলেণের সাথে এক দশক একত্র বাস করে যা বুঝতে পেরেছি তা হলো- মটরকারের চেয়ে ঘোড়া বা গরুর গাড়ী বাহন হিসাবে তার অধিক পছন্দ। তাই তাকে বেশীক্ষণ রোখা গেল না। নৃত্যশিল্পীদের মতো স্কার্টের ঝুল একটু তুলে শরীরকে একটি মুদ্রায় রূপান্তরিত করে সে সহসাই সিক্লোতে গদিনশিন হলো। ভিয়েতনামের সিক্লোগুলো আমাদের রিক্সার স্বগোত্রীয় বটে তবে ঠিক সদৃশ নয়। আমাদের রিক্সায় যেমন চালকের আসন যাত্রীদের সামনে, এখানে ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ বিপরীত; যাত্রীরা বসেন সামনে আর সিক্লোওয়ালা পিছনের উঁচুমতো সিটে বসে প্যাডেল মারেন। আরাম করে দৃশ্য দেখতে দেখতে পথ পাড়ি দেবো ভেবে নাগ্রা জুতার মতো সিক্লোর বাঁকানো পাটাতনে পা রেখে বেশ জাঁকিয়ে বসি। সিক্লোওয়ালা তার বাহন না চালিয়ে আমাদের মুখামুখি এসে দাঁড়িয়ে বেশ জোরে শোরে কিছু একটা বলেন। তার দুআঙ্গুলের গাঁটছড়া বাঁধার ইঙ্গিত থেকে বুঝতে পারলাম আমরা বিবাহিত কিনা তা জানতে চাচ্ছেন? অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কৌতূহল। আমরা তার অনুমানের সত্যতা অস্বীকার করি না। মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দেই। তাতে বুঝি তার কৌতূহলে ইন্ধন পড়ে। বাচ্চাদের দোল খাওয়ানোর ভঙ্গি অভিনয় করে তিনি এবার জানতে চান-এ ধরনের কিছু আমাদের আছে কি না? হলেণকে এবার সামলানো মুশকিল হয়। সে পার্স খুলে বের করে ছোট্ট একটি ছবির অ্যালবাম। অ্যালবামের প্রতি পৃষ্ঠায় আমাদের কন্যা কাজরির আলোকচিত্র। সিক্লো ড্রাইভার তা মনযোগ দিয়ে দেখতে শুরু করেন। পারিবারিক ছবিগুলো আর বেশীক্ষণ ব্যক্তিগত থাকে না। জনাতিনেক পথচারীও দাঁড়িয়ে পড়ে সিক্লোওয়ালার সাথে অ্যালবামের ছবি দেখায় সামিল হন। বাঁক কাঁধে ফুল বাগানের জন্য সৌখিন পাথর বিক্রেতা এক মহিলা দাঁড়িয়ে পড়ে কাজরির ছবি দেখে আমাদের মুখ পানে এমনভাবে তাকান- তার ভাব ভঙ্গিতে মনে হয় একটি কন্যা সন্তানের জম দিয়ে যেন কোন গুরুতর শরমের কাজ করে বসে আছি। সিক্লোওয়ালা বুঝি এবার তার সন্তান সন্ততির বর্ণনা দিতে শুরু করেন। দুহাতের আঙ্গুল দিয়ে সাত সংখ্যাটি নির্দেশ করে সাথে সাথে ইশারায় তিনি বুঝিয়ে দেন তার বালবাচ্চাদের উচ্চতা। আমি তার রোদচশমায় আমাদের ছায়া যুগলকে অস্থির হয়ে উঠতে দেখি।

অবশেষে আমাদের বুঝি কোন এক কেল্লার ঈষৎ মলিন রঙজ্বলা বৃহৎ তোরণের সামনে সিক্লোওয়ালা নামিয়ে দেন। আমি ভাড়া দিতে যাই কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেন না। তার দেহ ভঙ্গি থেকে বুঝতে পারি- আজ আমাদের সহজে রেহাই দিচ্ছেন না, এখানে মনে হলো তিনি অপেক্ষায়ই থাকবেন। হলেণ বাচ্চা ছাগলের মতো দাঁতে ড্রাগন ফ্রুট ছুলতে যাচ্ছিলো। সিক্লোওয়ালা রে রে করে ছুটে এসে পকেট থেকে বের করে দেন মরচে ধরা একখানা চাকু। হলেণের এবার আজব ফলটি ভোতা অস্ত্রে কর্তন করা ভিন্ন অন্য কোন গতি থাকে না। শতাব্দীপ্রাচীন তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে আমি ভাবি- ভেতরে বিষয়টি কী? হলেণ ততক্ষণে পুরাতত্ত্ব বিভাগের লাগানো যুগপৎ ফরাসী ও ভিয়েতনামিজ্ ভাষায় লেখা বিশাল ফলক পড়ে ফেলেছে। স্থানটি যে হ্যানয়ের বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক ভ্যান্ মিইয়ু বা টেম্পোল অব্ লিটারেচার তা বুঝতে আমাদের বিশেষ একটা বিলম্ব হয় না। তাবৎ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এক কালের অত্যন্ত খ্যাতিমান এ বিদ্যাপীঠের সূত্রপাত হয় নবম শতাব্দীতে। তারপর এগারো শতকে বিদ্যোৎসাহী সম্রাট লি থান তঙ প্রচীরঘেরা হ্যানয় নগরীর গোড়া পত্তন করলে ১০৭৬ সালে এখান গড়ে উঠে কুয়োক টু গিয়েম বা ন্যাশনাল ইউনিভারসিটি। মোটামুটি বিষয়টি হচ্ছে- এ ক্যাম্পাসে যুগে যুগে রাজকার্য পরিচালনা করার জন্য ভিয়েতনামের ম্যান্ডারিন বা অভিজাতবর্গ উচ্চশিক্ষা নিতেন।

আরো দুটি সিক্লো এসে তোরণের সামনে থামে। প্রথম সিক্লো থেকে নামেন পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো প্রায় প্রান্তিক বয়সের এক দম্পতি। প্রৌঢ় পুরুষটি এ ভর রোদে পরে আছেন হালকা সামার জ্যাকেট, তার দুআঙ্গুলের ফাঁকে আধপোড়া সিগার। মহিলার হ্যাটে গোঁজা গোটা তিনেক কৃত্রিম ফুল, তিনি দুহাত ভরে বয়ে বেড়াচ্ছেন ফ্লাস্ক, বেতের ঝুড়ি ও পেল্লায় একটি পার্স। দ্বিতীয় সিক্লোর যাত্রী এক কিশোরী। সে সাথে সাথেই সিক্লো থেকে না নেমে ছোলা দেখে ঘাড় বাঁকানো ময়নার মতো গ্রীবা বঙ্কিম করে তোরণের গায়ে-গাঁথা হারানো দিনের স্থাপত্য দেখে। তারপর স্কেচ্-খাতা খুলে আঁকতে শুরু করে। মহিলা বুঝিবা তার জননী হবেন, কাছে গিয়ে হালকা মুখ ঝামটা দেন, তাতে কাজ কিছু হয় না। অতঃপর তিনি ঝুড়ি থেকে অতি ক্ষুদ্র একটি ক্যামেরা বের করে চুরুট ফোঁকা স্বামীর হাতে দেন। স্বামী অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে ফ্লাশ ঝলকিয়ে স্কেচরতা কিশোরী কন্যার ছবি তুলতেই মেয়েটি রেগে মেগে সিক্লো থেকে নেমে এসে বাপের দিকে তেড়ে যায়। তার মাথায় ঝুটি করা এক গুচ্ছ সোনালি চুল সূর্য রশ্মিতে ঝিকিয়ে উঠে। আমি খানিক ধন্দে পড়ে যাই। দেখে শুনে এ পরিবারকে ভিয়েতনামিজ্ মনে হয়। মেয়েটিও চেহারা সুরতে ভিয়েতনামী, তার মাথার অধিকাংশ চুল কালো, তবে চূড়ো করা কেশগুচ্ছের শিখাটি স্বর্ণালী হলো কীভাবে? ভাবি বিষয়টি নিয়ে এক সময় নিভৃতে হলেণের সাথে আলাপ করতে হবে। পরিবার টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকছে। আমরাও তাদের অনুসরণ করি।

তোরণ যেমন প্রাচীন ভেতরের আঙ্গিনাও তেমনই পেল্লায়। দুপাশে চৌদেওয়ালের প্রান্ত ঘেঁষে দুটি সমান আকারের বাঁধানো পুকুর। আমরা বাম পাশের পুকুরের দিকে আগাই। হলেণ টিকেটের উল্টো পিঠের ফরাসী বর্ণনা ইতোমধ্যে পড়ে ফেলেছে। তার বাচনিকে জানা যায়- এখানে এ জোড়া পুকুর মাগুর মাছের চাষ কিংবা সাঁতার কাটার জন্য তৈরী হয় নি। এখানে প্রায় হাজার বছর আগে স্থাপিত এ  সনাতনী বিশবিদ্যালয়ে স্টাডি করনেওয়ালা পণ্ডিতরা বিদ্যাশিক্ষার ভারে লবেজান হয়ে পড়লে পড়ন্ত বিকালে একটি পুকুরের ঘাটে মৌন হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতেন নিজস্ব ছায়ার প্রতিফলন। নিজেদের ছায়ারূপ পর্যবেক্ষণ করতে করতে তারা ভাবতেন রজ্জুতে সর্প ভ্রমের জাগতিক বিভ্রান্তির কথা। তাদের মানসলোকে তখন নীরবে চুলচেরা বিশ্লেষণ হতো জ্ঞানের চিরায়ত রূপ বা জগৎ সংসারের নশ্বরতা নিয়ে। অন্য পুকুরটির কাজ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পণ্ডিত যশোপ্রার্থীরা এ ক্যাম্পাসের দীর্ঘবাসে মূলতঃ মশগুল থাকতেন পুঁথি পাঠ, বিতর্ক, কেলিওগ্রাফী ও তপস্যায়। কখনো কখনো শত সহস্র শ্লোক জপতে জপতে তারা হয়ে পড়তেন স্মৃতিবিধূর। তাদের মানসলোকে রজনীগন্ধার ঝাড়ে উড়ে আসা নিশিপতঙ্গের মতো ভেসে যেত দূরের গাঁয়ে ফেলে আসা কোন কিশোরীর সিগ্ধ আনন। বিরহ-দগ্ধরা জড়ো হতেন পূর্ণিমা রাতে অন্য পুকুরের পাড়ে। তারা কাগজের নৌকায় রূপালি কালিতে লিখতেন দয়িতার নাম। অলীক এ নাওগুলো সারা রাত ভেসে বেড়াতো জ্যোৎস্নায়।

অধুনা টেম্পোল অব লিটারেচার নামে পরিচিত এ বিদ্যাপীঠে এক সময় স্কলাররা কনফুসীয় ধারায় পড়াশুনা করে পরীক্ষা দিয়ে রাজ কর্মচারী হতেন। সমাপনী পরীক্ষা অন্তে স্বয়ং ভিয়েতনামের সম্রাট শিক্ষানবীশদের যাচাই করে রাজকীয় দায়িত্ব অর্পণ করতেন। সে যুগ বিগত হয়েছে অনেক কাল। আজকাল এখানে বিদ্যাশিক্ষার মাইফেল আর বসে না তেমন। তবে নানা দেশ থেকে হরেক রকমের পর্যটক হরদম আসেন সংরক্ষিত এ স্থানে ঘুরে বেড়াতে। হ্যানয়ের স্থানীয়রাও সময় সুযোগ হলে নাগরিক ঝুটঝামেলার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য এখানে এসে দুদণ্ড দাঁড়ান। আমরাও কিছুক্ষণ পুষ্করিণীর ঈষৎ সবুজ জলের পাশে দাঁড়িয়ে বেড়াতে আসা স্থানীয় তরুণ তরুণীদের দেখি। এক পারে বৃত্তের মতো গোল হয়ে বসে আছে বেশ কয়েকজন তরুণ। তাদের চোখে মুখে ধ্যানী বকের নিস্তব্ধতা। বৃত্তের ঠিক কেন্দ্রস্থলে রাখা একটি পাত্রে চীনেবাদাম, ভাজা রসুন ও ধনেপাতা। তরুণদের কেউই এ বালখিল্য আহারে মনযোগী হচ্ছে না। পুকুরের অন্যপারের দৃশ্যটি আরো নাটকীয়। বেশ কজন তরুণী রাজহাঁসের পালকের মতো শুভ্র টিউনিক ও ঢোলা পাজামা- অনেকটা আমাদের সেলওয়ার কামিজের মতো পরে ঝুঁকে শরীর মুচড়িয়ে নিজেদের প্রতিফলন দেখছে। পুষ্করিণীর ঠিক মধ্যিখানে ভাসছে রাংতা দিয়ে তৈরী পালতোলা একটি জাহাজ। আমাদের যুগল ভ্রমণে আমি কেবল দেখেই যাই, ভাবনা করার দায়িত্ব সচরাচর বর্তায় হলেণের উপর। সে কেবল ভাবেই না, তার আচরণ থেকে মনে হয় দৃশ্যের গভীরে আপাত-গোপন কিছু থাকলে তার তর্জমা করার দায়িত্বুও সে তুলে নেয় আপন কাঁধে। তাই আমি তার দিকে পথচলতি ব্যাখ্যার জন্য তাকাই। সে ইতোমধ্যে সৌখিন গোয়েন্দার তৎপরতায় ছেলে ও মেয়েদের দুটি দলের আদম শুমারী করে ফেলেছে। তার কাছ থেকে জানা যায় যে-দুদলে আছে নজন তরুণ ও ঠিক নজন তরুণী। এ পর্যন্ত বলে সে চুপ করে যায়। আমি ভাবি তারপর আর বলার কিবা আছে।

 আমরা এবার অন্য প্রান্তের পুকুরের দিকে হাঁটি। তোরণের সামনে দেখা পরিবার একটি প্রকাণ্ড মিমোসা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে। কিশোরিটি গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার বাবা ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা তাক করে। মেয়ে ত্বরিতে স্কেচ-খাতা দিয়ে চোখ মুখ ঢাকে। এ নিয়ে বুঝি পরিবারে একটু রগড় হয়। বাবা উচ্চ স্বরে হেসে উঠেন। তার সিগার থেকে ভেঙ্গে পড়ে এক রাশ ছাই। মেয়েটিও আঁকিবুকির পাতায় মুখ ঢেকে হাসে। তার নগ্ন নাভিকুণ্ডের চার পাশে উল্কিতে আঁকা কালচে সবুজ তিনটি টিকটিকি তির তির করে কাঁপে। আমরা বেশী কাছে যেতে লজ্জা বোধ করি। তাই অন্য দিকে ফিরি। আমি হলেণকে বলি- মেয়েটি বোধ হয় দত্তক বা এডাপ্ট করা। হলেণ আমার অনুমান হেসে উড়িয়ে দেয়। আমি চূড়া করে বাঁধা সোনালি চুলের কথা বলি। সে জবাব দেয়- ও হচ্ছে ডাই বা রঙ করা ব্লন্ড। আমরা আর কথা বাড়াই না।

ছোট্ট কিন্তু চমৎকার কাঁচ ও বৃত্তের নকশা করা লোহিত বর্ণের আরেকটি দ্বিতল তোরণ দিয়ে আমরা ভেতরের মহলে ঢুকি পড়ি। একটি মোজেক করা পাথরের সিঁড়ি উঠে গেছে দেউড়ির প্রশস্ত দোতলায়। আমরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠি। ভিয়েতনামিজ্ সাহিত্যের ইতিহাসে এ ভবন খুক ভ্যান্ ক্যাক্ বলে পরিচিত। এক সময় এ গৃহে প্রবেশাধিকার ছিল কেবল মাত্র টেম্পেল অব্ লিটারের্চা থেকে সমাপনি সনদ্ প্রাপ্ত সম্রাটের দরবারের অনুমোদিত কবিদের। তারা রাজ তোষণের অবসরে কখনো সখনো ফিরে আসতেন তারুণ্যের স্মৃতিবিজড়িত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে তাদের পরিবেশন করা হতো লোটাস্-ওয়াইন বা পদ্মগন্ধী মদিরা। পান প্রক্রিয়ায় নিশি গভীর হলে তারা মুখে মুখে রচনা করে যেতেন শ্লোক্। ক্যালিওগ্রাফে পারদর্শী নওল কিশোরীরা তা রাইস-পেপারে তুলি দিয়ে লিখে রাখতো। আমরা এ ঘরে লোহিতে ঘোরতর কৃষ্ণ বর্ণের ছবি আঁকা সিলিন্ডারের মতো কিছু আাধার দেখতে পাই। ফলক পড়ে জানা যায় যে- এ সব আধারে আজো সংরক্ষিত আছে বিগত জামানার কিছু চমৎকার কাব্যকলা। এ ঘরে ভিয়েতনামিজ্ কবিতার তিন তুখোড় দিকপাল ইয়ান হয়ে, জেং সেন ও জিসি মিসিয়াসের মূর্তিও রাখা আছে। শোনা যায় গ্রন্থ প্রকাশ হলে কোন কোন তরুণ কবি একবিংশ শতাব্দীতেও এখানে এসে ধূপ ধুনা জ্বেলে যান।

আমরা এবার চলে আসি থাপ-রোয়া টাওয়ার বলে পরিচিত দুটি বেলে পাথরে তৈরী খিলানের সামনে। চারকোনা এ ধূসর থাম যুগলে ক্যালিওগ্রাফীতে উৎকীর্ণ তেরোটি নাম। সকলেই এক সময় শিক্ষার্থী ছিলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের। পরবর্তীকালে এরা লেখনী ও শিল্পিত প্রতিভার জোরে রেখে যান ভিয়েতনামের সামাজিক ইতিহাসে কালোত্তীর্ণ স্বাক্ষর। থাপ-রোয়া টাওয়ারের প্রেক্ষাপটে বোধ করি তাদের স্বীকৃতিতে প্রায় ছশ তিরিশ বছর আগে তৈরী করা হয়েছে মোজাইক করা এক চিত্রের। ছবিতে সহস্রায়ু এক কাছিমের প্রতিকৃতি যা জ্ঞানার্জনের চিরায়ত প্রতীক হয়ে অনেক শতাব্দী পর আজো পর্যটকের চোখে উজ্জ্বল হয়ে ভাসে।

ভেতরের মহলের দুপাশে দুটি প্যাভিলিয়নের মতো লম্বা ছাদের ঘর। আমরা ডান দিকের প্যাভিলিয়নে প্রবেশ করি। এ ঘরের দেয়াল পুরানো দিনের বৃহৎ বৃহৎ চিত্র দিয়ে সাজানো। ফ্রেমের নীচে ইংরেজী, ফরাসী ও পুরানো দিনের ভিয়েতনামী লিপিতে বিষয়বস্তুর বর্ণনা। প্রথম চিত্রটি দেখে হলেণ রীতিমত শিউরে উঠে। এক শিক্ষানবীশ পণ্ডিতকে তার গুরু বোধ করি পড়া না শেখার কারণে বাঁশ-পেটা করছেন। তার পাশের ছবিতে ছাত্র জীবনের সার্থকতা ও সনদ প্রাপ্তিতে সমান লাভের বিরল দৃশ্য ফুটে উঠেছে। মানপত্র লাভ করে এক স্কলার টাট্টু ঘোড়ায় চেপে নিজ গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। পণ্ডিতটি এ ছবিতে নিঃসঙ্গ নন। তার সামনে শিঙ্গা ফুঁকে ছুটে চলেছে রাজকীয় নকীব। পণ্ডিত মশাইয়ের সাথে সাথে চলছে পতাকা ও ছত্র হাতে দুই বরকন্দাজ। সবশেষে গাধার পিঠে চেপে চলেছে পুঁথিপত্র ও পাণ্ডুলিপির বোচকা। গ্রাম থেকে বৃদ্ধ পিতা লাঠি ঠুকে ঠুকে আসছেন করিৎকর্মা দিগ্গজ পণ্ডিত ওরফে ভবিষ্যৎ রাজকর্মচারী পুত্রকে এগিয়ে বাড়ী নিয়ে যেতে। গ্রামে কুমারী কন্যারাও এসেছে সেজেগুজে ফুল ফল নিয়ে মহা আড়ম্বরে।

আমরা বাম পাশের প্যাভিলিয়নের দিকে ফিরি। প্যাভিলিয়ন দুটির মাঝামাঝি লতানো নরম এক ধরনের গাছে তৈরী মস্ত এক মৃৎপাত্র। দুটি লতায় বোনা ময়ূর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বৃত্তাকার এ চত্তরের দুপ্রান্তে চীনা মাটির পাত্রে রক্ষিত দুখণ্ড বিপুল রক্। একটি রকের পাশে বেঞ্চে বসে আছে খানিক আগে দেখা ভিয়েতনামিজ পরিবার। মহিলা ফ্লাস্ক থেকে প্লািটকের কাপে তার স্বামী ও কিশোরী কন্যাকে চা ঢেলে দিচ্ছেন। আমি হলেণকে চুপিসারে মন্তব্য করি- এরা দেখতে ভিয়েতনামিজদের মতো হলেও বোধ করি এরা ভিয়েতনামের লোক না। বলা মাত্রই বুঝতে পারি সাঁকো নাড়া হয়ে গেছে। হলেণ ওদের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে বসে- ওরা কোথাকার? পুরুষ জবাব দেন,আমরা ভিয়েতনামিজই, তবে যুদ্ধের পর থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ড শহরে বাস করছি। হলেণের সাথে পরিবারের খুচরো আলাপ জমে উঠতে দেরী হয় না। কিশোরী মেয়ে বাপের কানে কানে কী যেন বলে। বাপ রুমালে চশমাটি মুছে তা চোখে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে একটু ইতিউতি করেন। তারপর দুম্ করে বলে বসেন- তার মেয়ে বলেছে হিন্দি সিনেমায় নাকি সে আমার মতো একজনকে অভিনয় করতে দেখেছে। যে আমি স্কুল নাটকে চাকর বাকরের পাটে অভিনয় করার অনেক চেষ্টা করে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি, মন্তব্য শুনে ভাবি- যাক জীবনে বুঝি এতদিনে সফলতা এসে যাচ্ছে। মেয়ের মা এবার কলকল করে বলেন- ওকল্যান্ডে তাদের প্রতিবেশীরা সকলে ইন্ডিয়ার মধ্য প্রদেশের। মেয়ে প্রায়ই তার ইন্ডিয়ান বান্ধবীদের সাথে হিন্দি ভিডিও দেখে। এমন কী সে হিন্দি সিনেমার নাচ পর্যন্ত রপ্ত করে বসে আছে। মা তার ভাষ্য সম্পূর্ণ করতে পারেন না, মেয়েটি দাঁড়িয়ে শরীর দুলিয়ে একটি নৃত্য ভঙ্গি করে। হঠাৎ হাওয়ায় দুলে ওঠা ফলের মতো ট্যাংকটপে অর্ধ আচ্ছাদিত তার সম্প্রতি ফোটা স্তনযুগল দুলে ওঠে। মেয়েটির নৃত্যভঙ্গি আরো বিস্তৃত হয়। আমি মনে মনে হা হা করে উঠি- বালিকাটি করছে কী?

পরিবারের সাথে কথাবার্তা বলতে বলতে আমরা খোলামেলা দেয়ালহীন একটি প্যাভিলিয়নে চলে আসি। এতে ফায়দা একটা হয়- ভিয়েতনামি কর্তাটি দৃশ্যত সমস্ত কিছুই যুগপৎ ধারাবর্ণনা ও ব্যাখ্যা দিয়ে চলেন। মেয়েটিও আর নৃত্য-মুডে নেই। একটি পিলারে হেলান দিয়ে সে বসে পড়ে স্কেচবুক নিয়ে। এখানে সংরক্ষিত পাথরে খোদাই নানা আকৃতির বিরাশিটি কচ্ছপের মূর্তি। চুরুটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে কর্তা জানান- ভিয়েতনামি সংস্কৃতিতে কচ্ছপকে দীর্ঘ জীবন ও স্থায়িত্বের পবিত্র প্রতীক মনে করা হয়। প্রতিটি কচ্ছপের পিঠে শিল নোড়ার শিলটির মতো মস্ত মস্ত পাথুরে ট্যবলেট। ট্যবলেটগুলোতে উৎকীর্ণ প্রাচীন ভিয়েতনামিজ্ লিপি। তার ভাষ্য থেকে আমরা জানতে পারি- অতীতে প্রতি বৎসর যে সব বিদ্যার্থী এ বিশবিদ্যালয় থেকে সনদ পেতেন তাদের নাম, সাকিন ও সন শিলালিপিতে উৎকীর্ণ আছে। তিনি প্যাকেট থেকে আরেকটি চশমা বের করে বুঝি দৃষ্টিশক্তি প্রখর করে নেন। নিভে যাওয়া চুরুটে সুখটান দিয়ে একটি রাম সাইজের কাছিমের পিঠে দাঁড় করানো শিলা পরখ করে স্ত্রীকে বলেন, এটা দেখো তো, না এ বছর কেউ প্রথম বিভাগ পায় নি। তারপর দুজন নিজস্ব ভাষায় পরামর্শ করতে শুরু করেন। তাদের ব্যক্তিগত আলাপের সুযোগ দিয়ে আমরাও একটু দূরে সরে যাই। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে একটি আর্তনাদ শুনে চমকে উঠে ভাবি- ভদ্রলোককে সাপে খোপে কাটলো কী? কী হয়েছে জানতে হলেণ ও আমি দ্রুত তাদের কাছাকাছি ছুটে আসি। মেয়েটিও স্কেচবুক বন্ধ করে চলে এসেছে। দম্পতি একটি শিলালিপির সামনে বজ্রাহত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অবশেষে জানা যায় যে- ভদ্রলোকের মায়ের দিকের এক পূর্বপুরুষ প্রায় তিনশ তেরো বছর আগে এ বিশবিদ্যালয় থেকে সনদ পেয়েছিলেন। কথাটি বংশানুক্রমে গল্পে গল্পে চালু ছিল। কখনো কেউ তার সত্যতা যাচাই করে দেখেনি। মহিলাটি আরো জানান- গত বছর পাঁচেক ধরে আমেরিকাতে ভদ্রলোকের শরীর খারাপ যাচ্ছে। প্রায়ই স্ত্রী কন্যাকে বলেন একবার শেষ বারের মতো ভিয়েতনামে যেতে হয় কিন্তু। গেলে নিশ্চয়ই বিশবিদ্যালয়ে খোঁজে দেখতে হবে নামটি সত্যি সত্যি কচ্ছপের পিঠে লেখা আছে কী না? ছবি তুলতে গিয়ে ভদ্রলোক বলেন, আমার হাত কাঁপছে, আপনি কী কাইন্ডলি কচ্ছপওয়ালা শিলালিপির সামনে আমাদের পরিবারের একটি ছবি তুলে দেবেন?

ছবি তুলে দিয়ে পরিবারকে নিজস্ব সময় দেয়ার জন্য আমরা প্যভিলিয়নের অন্যদিকে সরে আসি। আদ্যিকালের এ বিশবিদ্যালয়ের আঙ্গিনা ও চত্তরের যেন শেষ নেই। আমরা আরেকটি দেউড়ি অতিক্রম করে চলে আসি জ্ঞানপীঠের সর্বশেষ মহলে। এখানে একটি বৃহৎ মণ্ডপের মতো। কেন্দ্রীয় বেদী জুড়ে কনফুসিয়াসের বৃহৎ বিগ্রহের অধিষ্ঠান । চীনে দার্শনিক কনফুসিয়াস এখানে একা নন। দুপাশে ঈষৎ নত হয়ে বসে আছেন তাঁর চার চেলা। সকলেই পাচ্ছেন অল্প বিস্তর ধূপধুনা। ভিয়েতনামী পর্যটকরা রীতিমত হাঁটু গেড়ে পূজা প্রণাম করছেন। মণ্ডপের বারান্দায় গুরু প্রণামের আরেকটি থান। ওখানে বঙ্কিম এক ধাতব ড্রাগন পাহারা দিচ্ছে ধূপকাঠি জ্বালানোর প্রকাণ্ড বোঞ্জের পাত্র। এক তরুণী হাতে একগোছা জ্বলন্ত ধূপকাঠি নিয়ে প্রণত হয়। মেয়েটির চোখ বেজায় রকমের বিষণ। তার পূজাপাট সমাপ্ত হলে হলেণ কছে গিয়ে তার সাথে কথা বলে। মেয়েটি এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো চেষ্টা করছে হ্যানয়ের মেডিকেল কলেজে ঢোকার। আগামীকাল তার এডমিশন টেস্ট। কাছাকাছি একটি ড্রাগনের মটিফ আঁকা একটি বৃহৎ বোর্ড। আন্দাজ করি এ বোর্ডে সফল শিক্ষার্থীদের নাম প্রকাশ পেত।

মন্ডপের অন্য প্রান্তে এক ঝাঁক মুনিয়া পাখির মতো রঙচঙে অনেকটা আমাদের ম্যাক্সির মতো দীর্ঘ পোষাক পরে দাঁড়িয়ে আছে জনা পাঁচেক কিশোরী। তাদের কারো কারো মাথায় সিল্কের হেডগিয়ার বা শিরবন্ধনী । মেয়েগুলোর সকলের সামনে গুছিয়ে রাখা কোন না কোন বাদ্যযন্ত্র। আমরা ভাবি মেয়েগুলো বাজিয়ে টাজিয়ে শুনাবে নাকি? একটি বালিকার সাথে চোখাচোখি হতেই সে এগিয়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা করে নিয়ে যায়। আমাদের বসার জন্য দেয়া হয় মাদার অব পার্ল বা মুক্তা ফলানো ঝিনুকের কাজ করা দুটি চেয়ার। বালিকারা ঈষৎ ঝুঁকে আমাদের অভিবাদন করে শুরু করে বৃত্তাকারে নৃত্য। নাচ সমাপ্ত হয় অতি দ্রুত। এবার খানিক দূরে একা বসে থাকা লোহিত বর্ণের পোষাকপরা একটি মেয়ে বাজাতে শুরু করে তারের একটি যন্ত্র। সে মাঝ পথে বাজনা থামিয়ে ইংরেজীতে জানায় যে বাদ্য যন্ত্রটির সূক্ষ্ম তার মহিষের অন্ত্র দিয়ে তৈরী। সে আবার বাজনায় ফিরে গেলে আমরা মন্ডপে শত শত ফড়িংয়ের পাখার উড্ডীন ধনি শুনতে পাই। সাথে সাথে আরেকটি কিশোরী বাঁশের টিউবে তৈরী বাদ্যযন্ত্রে হাততালির প্রতিধনি সৃষ্টি করতে থাকে। অন্য মেয়েগুলোও এ পর্বে সক্রিয় হয়। খানিক নৃত্যের ভঙ্গিতে একটি বালিকা আমাদের পরিবেশন করে হাতলহীন ক্ষুদ্র পাত্রে কমলা লেবু রঙের চা। আমরা সুগন্ধী তবে তিতকুটে স্বাদের পানীয় তারিয়ে তারিয়ে পান করি। এবার দুটি মেয়ে যুগল নৃত্যে আমাদের কাছাকাছি চলে আসে। একটি মেয়ে আমাদের উপহার দেয় দুটি রক্তিম গোলাপ। অন্য মেয়েটি এসে পরিয়ে দেয় খুঞ্চার মতো গোলাকার বেতের মাথাইল। আমি অবাক হয়ে এ মধুর আচরণের মর্মার্থ বুঝতে চেষ্টা করি। হলেণ আমাকে ফিসফিসিয়ে বলে যে- সে একটি দেয়ালচিত্রে দেখেছে এভাবে মাথাইল পরিয়ে চা ও ফুল দিয়ে গাঁয়ের কুমারীরা পরীক্ষা উত্তীর্ণ স্কলারকে অভ্যর্থনা করতো। আমি মনে মনে শঙ্কা বোধ করি। হলেণকে বলি- এবার মানে মানে কেটে পড়তে হয় কিন্তু! সে অবাক হয়। আমি তাকে অবশেষে সত্য ঘটনা খুলে বলি যে- আমার একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড এ্যয়সা বাজে এবং ভেতরে ভেতরে আমি কতটা অকাট মূর্খ এ খবর জানতে পারলে হয়তো মেয়েরা এরপর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাডিশন মাফিক আমাকে বাঁশ-পেটা করবে। তাই আমাদের উঠতে হয়।

তোরণে এসে দেখি সিক্লোওয়ালা মাথায় বেইসবল ক্যাপ্ পরে বিশ্রাম করছেন। সিক্লোর পাটাতনে রাখা তার বেতের মাথাইল, পাশে অবহেলায় পড়ে আছে হলুদ বর্ণের রোদচশমা। তার মাথাইলে কিলবিল করে নড়ে তাজা রূপালি কিছু মাছ। আর তিনি সিটে বসে বেড়ালের মতো থাবা পেতে হ্যানয় এর মিঠে রোদ পোহান।

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology