বার্মা

বাহাদুর শাহের সমাধিতে

প্রকাশ : 31 আগস্ট 2014, রবিবার, সময় : 08:33, পঠিত 1714 বার

মঈনুস সুলতান
অনেক দিন আগের কথা, বছর পঁচিশেকতো হবেই। আমাদের গ্রামের বাড়ীর টঙ্গিঘরের বারান্দায় বসে একখানা মলাট-বিহীন বই পড়ছিলাম। পুস্তকটির বয়স হয়েছে, প্রথমদিকের পৃষ্ঠাগুলো খোয়া গেছে বলে গ্রন্থকারের নাম ইত্যাদি জানা গেল না বটে, তবে এখনো যা মনে আছে তা হলো- বিষয়টি ছিল মোগল রাজত্বের শেষ দিকে সিপাহী বিদ্রোহের বৃত্তান্ত। এতকাল পরেও বইটির শেষ বাক্য,অতঃপর সম্রাট বাহাদুর শাহ রেংগুনে নির্বাসিত হন, আজ অব্দি দিব্যি মনে আছে। সাথে সাথে এক প্রচইমব কৌতূহল-তারপর কি হল? রেংগুনে নির্বাসিত হয়ে সম্রাট কতদিন বেঁচে ছিলেন? কৌতূহলটির যে আজো মৃত্যু হয়নি, তা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম রেংগুন শহরে নেমেই।

বর্মা- যাকে অধুনা ফৌজি শিষ্ঠাচারানুযায়ী মিয়ানমার বলা হয়ে থাকে, সে প্রসংগ থাক। আমরা এখানে সপরিবারে এসেছি দিন কতকের অবসর কাটাতে। রেংগুন বিমান বন্দরে নেমেই মনে হলো- বাহাদুর শাহ নিশ্চয়ই এ শহরে সমাহিত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর কবরটি খুঁজে পাই কিভাবে? আমার স্ত্রী হলেণ হোটেলে আসা মাত্রই ম্যানেজারের সাথে কথাবার্তা বলে রেংগুন শহরের একখানা ম্যাপ জোগাড় করলো, কিন্তু তাতে বাহাদুর শাহের সমাধির কোন হদিশ পাওয়া গেল না। তাতে নিরুৎসাহিত না হয়ে সে পরামর্শ দিলো- রুম সার্ভিসের বেয়ারাটির সাথে কথা বলার জন্য। বেয়ারাটি ইংরেজী বলে ভালোই, তবে তার বিচার বুদ্ধির উপর আমার বিশেষ একটা ভরসা নেই। রেংগুনে এসেই তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম-কোথায় একটি শস্তা মানের ভারতীয় রেস্তোরাঁ পাওয়া যাবে? সে আমাদের যে স্থানে পাঠিয়েছিল, সেখানে খেতে হয়েছিল নানরুটির পরিবর্তে ইটালীয় পাসটা; এবং খাবারের যে দাম দিতে হয়েছিল তাকে যদি শস্তা বলা যায়, তবে অতি অবশ্যই অভিধান থেকে অতিমূল্য শব্দটি খারিজ করে দিতে হয়। কিন্তু হলেণ যখন তার সাথে শলাপরামর্শের প্রস্তাব দিল, আমি নিতান্ত গৃহযুদ্ধ এড়ানোর জন্য তাতে রাজী হলাম। বেয়ারাটিকে অতঃপর যুগলে জিজ্ঞেস করা হলো- বাহাদুর শাহের কবরটি কোথায়? বাহাদুর শাহ ব্যক্তিটি কে-তা যাতে সে সাফ সাফ বুঝতে পারে তার জন্য প্রশ্নটির সাথে অতিরিক্ত বর্ণনা হিসাবে যোগ করলাম, ইন্ডিয়া কা লাস্ট কিং, মোগল কা শেষ বাদশাহ ইত্যাদি বাক্যাংশ। তার চোখমুখের অভিব্যাক্তি দেখে মনে হল- সে সম্রাটের সাথে রীতিমতো পরিচিত। দ্রুত আমাদের নিয়ে রাজসড়কে এসে একটি রিক্সায় তুলে চালককে সম্ভবত সমাধির ডাইরেকশন দিয়ে হেসে হাত নেড়ে সে বিদায় নিল।

রেংগুনে রিক্সা নামক যানটির যে এরকম আকৃতি হতে পারে তার কোন পূর্বজ্ঞান আমার ছিল না। এ যেন শক্তপোক্ত একখানা বাইসাইকেল যার ডানদিকে যুক্ত জনা দুই যাত্রীর মুখোমুখি নয়-পিঠেপিঠি বসার সিট্। তাই আমাদের কন্যা কাজরিকে কোলে নিয়ে আমি যে দিকে মুখ করে বসলাম-তার ঠিক বিপরীত দিকে আসন নিলো হলেণ। এতে যুগলে আমাদের আলাপচারিতা বিশেষ হলো না বটে, তবে ভোর বেলাকার রেংগুন শহরের খানিক চলমান দৃশ্যাবলী দেখতে সুবিধাই হলো। আমাদের রিক্সাটি চলছে রেইনট্রি শোভিত একটি পয়পরিষ্কার সড়ক ধরে। পথে গুচ্ছ গুচ্ছ ছাত্রছাত্রী চলছে বইখাতা নিয়ে স্কুল অভিমুখে। ছেলেমেয়ে উভয়ের পরনে লুঙ্গি। ছেলেদের লুঙ্গিগুলো বর্ণে ম্রিয়মান ও ডিজাইনে চেককাটা। বালিকাদের লুঙ্গিগুলো শরীরের সাথে খানিক আটসাট ও বর্ণবহুল। স্কুলগামী কিশোরীদের মুখে শ্বেতচন্দনের ছোপ্ ছোপ্ প্রলেপ। সড়কের দুপাশে ঘরবাড়ীর অনেকগুলোই বেশ পুরানো উপনিবেশিক আমলের। বেশ কটি বাড়ী জরাজীর্ণ, তবে কাঠের তৈরী এ ঘরগুলোর ডিজাইন চেয়ে দেখার মতো। সম্পূর্ণ বর্মাটিক কাঠ ও লোহিত বর্ণ টাইলে নির্মিত একটি বহুকোণ ও একাধিক ছত্রবিশিষ্ট ত্রিতল বাড়ীর আঙ্গিনা ঘেসে আমাদের রিক্সাটি দ্রুত ছুটে যায়। পুরানো এ বাড়ীটির শ্যওলাময় আঙ্গিনায় জালিতার টাঙ্গিয়ে তৈরী হয়েছে আলোছায়াময় অর্কিড কুঞ্জ। একটি রকমারী লুঙ্গি পরা বালিকা মনে হলো কোন কারণ ছাড়াই পুষ্পিত পরগাছা আলো করে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে।

অবশেষে রিক্সাটি সম্রাটের সমাধির কাছাকাছি পৌঁছে আমাদের নামিয়ে দিল। আমি যখন ভাড়া মেটাচ্ছি হলেণ তখন মন্তব্য করে, বেয়ারাটি স্থানীয়, রেংগুনের অন্ধিসন্ধি সে ভালোই জানে, তার পরামর্শ নেয়াতে আজ কোন ঝামেলা ছাড়াই সমাধিতে পৌঁছলাম। আমি মন্তব্যের কোন জবাব না দিয়ে রিক্সাওয়ালার নির্দেশিত ভবনটির দিকে তাকাই। গৃহটি দ্বিতল, ছাদে নক্সী টাইলস্, আকারে বৃহৎ ও বয়সে বাড়ীটি রীতিমতো পুরানো। ভাবলাম সম্রাটকে হয়তো এ বাড়ীতে নজরবন্দী করে রাখা হয়েছিল? পরে মৃত্যু হলে হয়তো এ বাড়ীর আঙ্গিনায় কোথাও তাঁর গোর হয়েছে। বাড়ীটি পুরানো বটে, তবে ঘরটিকে ১৮৫৭ সালের মনে হলো না। ভাবলাম, আদি ভবনটির সংস্কার করিয়ে পরবর্তীকালে হয়তো মিউজিয়াম বানিয়েছে। আমারা ঢুকার জন্য পা বাড়ালাম, কিন্তু গেইট অব্দি পৌঁছতে পারলাম না। লুঙ্গি পরা গাব্দাগোব্দা চেহারার এক ব্যাক্তি মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে এসে আমাদের থামালেন। সাথে সাথে ভোজবাজির মতো জনা চারেক সৈনিক বন্দুক সহ আমাদের চারপাশে এসে ঘিরে দাঁড়ালো। আমি বিনীতভাবে ইংরেজীতে তাদের বলি,সম্রাট বাহাদুর শাহের মাজারে যাবো। সৈনিকদের কেউই কোন জবাব দেয় না। লুঙ্গিপরা ব্যক্তিটি মনে হলো আমার প্রশ্নে খানিক বিভ্রান্ত। তিনি জানতে চাইলেন -আমার ন্যাশনালিটি কি? আমার জবাবের আগেই এক সৈনিক এসে আমার হাত থেকে ক্যামেরাটি নিয়ে তা থেকে ফিল্ম খুলে নেয়। তার তৎপরতা দেখে মনে হলো এ কাজ সে প্রায়ই করে থাকে। লুঙ্গিপরা কর্মকর্তাটি তার থুতনির আচিলের উপর গজানো গোটা তিনেক দাড়ি চুমরিয়ে,ডু নট কাম হিয়ার এগেইন বলে সৈনিকটির হাত থেকে ক্যামেরাটি নিয়ে আমাকে তা ফেরত দিলেন। সাথে সাথে সৈনিকটি বন্দুক বাগিয়ে চিৎকার করে উঠলো,গেট আউট, গো এ্যওয়ে। পরিস্থিতির প্রতিকূলতায় ঘা খেয়ে আমরা দ্রুত উল্টাদিকে হাঁটতে শুরু করি। বর্মী সেনাটি খেতের বেড়া ভাঙ্গা ছাগল তাড়না করার মতো আমাদের খানিক তাড়িয়ে গলি থেকে বের করে বড় সড়কে তুলে দিয়ে ফিরে যায়।

রোদের তাপ ক্রমশ বাড়ছে। কোথাও কোন রিক্সা বা ট্যাক্সি নেই। আমরা দিগভ্রান্তভাবে দ্রুত হাঁটছি। অবশেষে বিস্তীর্ণ এক সরোবরের গাছপালাপূর্ণ পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। আমাদের উপর দিয়ে যে সেনা ঝকমারিটি হয়ে গেল, তাতে আমরা ঠিক ভীত হইনি বটে, তবে বিভ্রান্ত হয়েছি প্রবলভাবে। কোনভাবেই বুঝতে পারলাম না, সম্রাটের মাজারে যেতে গিয়ে বন্দুক-তাড়া খাওয়ার মতো গুনাহ্ করলাম কখন! ততক্ষণে হলেণ তপ্ত ও ঘর্মাক্ত, অমাদের ছোট্ট কন্যাটিও তৃষ্ণার্ত। সরোবরের পাড় ঘেসে একটুখানি উপদ্বীপের মতো ডাঙ্গা, সেখানে একটি দৃষ্টি আকর্ষক বাংলো। একটি তীর চিহ্নিত কাষ্ঠ ফলকে লেখা দেখি বোট ক্লাব। হলেণ খানিক জল পান করে

জিরিয়ে নেয়ার জন্য ওখানে যেতে চায়। অবশেষে আমরা সুনসান বাংলোটির কাঠে নির্মিত ডেকে এসে দাঁড়াই। চারদিকে তাকিয়ে মনে হয় ক্লাবঘরটি বন্ধ। ডেকের প্রান্ত ঘেসে বিস্তীর্ণ টলটলে জল, একটু দূরে বিপরীত পাড়ের শ্যামলিম রেখা। ডেকের সাথে সংযুক্ত একটি জেটির মতো ব্রীজ, তার দুপাশে বাঁধা কটি পালতোলা শৌখিন নৌকা। আমরা একটি রঙিন ছাতার নিচে স্থাপিত চেয়ারে হাঁপ ছেড়ে বসি। খানিক জিরিয়ে নিয়ে চারদিকে ইতিউতি তাকাচ্ছি- এমন সময় গামছা পরা এক ব্যক্তি নিড়ানি হাতে এসে উপস্থিত হন। তার চোখমুখের দিকে একটু মনযোগ দিয়ে তাকিয়ে আমি আন্দাজে জিজ্ঞেস করি, আপনি বাঙালি? তড়িৎ জবাব আসে, হ্যাঁ স্যার, আমার মূল বাড়ী চাটগাঁয়ের পটিয়া থানায়। তাকে একটু আগে ঘটে যাওয়া সেনা ঝকমারীর বৃত্তান্ত খুলে বলি। তিনি তাজ্জব হয়ে বলেন, ওখানে গেলেন কেন স্যার? ওটাতো বর্মার বিরোধী দলের নেত্রী আং সাং সুকীর বাড়ী, ওখানে যাওয়াতো ডেইনজারাস স্যার। এবার আর আমাদের ফৌজি ফ্যাসাদের কারণ বুঝতে বিলম্ব হলো না। পটিয়া থানার দেশী আমাদের, এদেশে মিলিটারীগুলো খুব বদমাশ বলে সান্ত্বনা দিলেন। তারপর বাগানে তার কাজের শেড থেকে নিয়ে আসলেন পানি ও আনারস। আমি গুম হয়ে বসে আছি দেখে হলেণ হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, তুমি কি বেয়ারাটির উপর রেগে যাচ্ছো? আমি জবাব দিই, ঠিক রেগে যাচ্ছি না, তবে তার গালে বাটা কোম্পানির পাদুকাটি ছোঁয়াতে বাসনা হচ্ছে। আমাদের কন্যা কাজরি ততক্ষণে ব্রীজের রেলিং বেয়ে উপরে ওঠার সক্রিয় চেষ্টা করছে, তাই নজর সেদিকে ফেরাতে হয়।

পানি ও আনারস খেয়ে খানিক ধাতস্ত হলে পর পটিয়ার দেশীকে জিজ্ঞেস করি, বাদশাহ বাহাদুর শাহের মাজার কোথায় তা তিনি জানেন কিনা? তিনি কানে গোঁজা চুরুটটিতে আগুন দিয়ে এমনভাবে ধোঁয়া ছাড়েন তাতে সম্রাটের নাম কখনো শুনেছেন বলে মনে হলো না। খানিক চুরুট ফুঁকে তিনি অবশেষে বলেন, জাফর শাহ ফকিরের মাজারে যাবেন নাকি স্যার? সম্রাট যে জাফর নামে পরিচিত ছিলেন তা তড়িৎ গতিতে মনে আসে। আরেকবার যাতে ফৌজি দিগদারীতে না পড়ি সে জন্য তাকে আবার জিজ্ঞেস করি, উনি দিল্লীর বাদশাহ ছিলেনতো? দেশী জানান, বাদশাহী ছেড়ে দিয়েইতো তিনি পরে ওলি হন স্যার। এ তথ্যটি আমার ঠিক জানা ছিল না, আমি আর দেশীর সাথে এ নিয়ে কোন বিতর্কে জড়াতে চাই না। তিনি আমাদের একটি রিক্সায় তুলে দিয়ে স্লামালেকুম বলে বিদায় নেন।

রিক্সাটি আমাদের যে স্থানে নামিয়ে দেয়- সেখানে মাজার সমাধি কিছুই দেখতে পেলাম না। সড়কটি ভীড় ভারাক্রান্ত নয়। পাশের একটি চায়ের দোকানের নিকানো উঠানে বাঁশঝাড়ের ছায়ায় নিচু টেবিল ঘিরে ততোধিক নিচু টুলে বসে জনা কয়েক বর্মী তরুণ চা পান করছে। অন্যদিকে আরেকটি নিরিবিলি টেবিল। টুলে বসে চা খাচ্ছেন সফেদ দাড়িওয়ালা লাঠি হাতে এক ব্যক্তি, তার মাথার গোল টুপিটি পেয়ালার পাশে রাখা। বৃদ্ধ দেখতে কোন মক্তবের মৌলভী বা মসজিদের খতিবের মতোই। ভাবলাম উনার কাছে হয়তো সমাধির তালাশ পাওয়া যাবে। কাছে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিয়ে বললাম, হিন্দস্থান কা আখেরি বাদশাহ কী মাজার কাঁহা হুজুর? তিনি পরিষ্কার উর্দূতে জবাব দিলেন, জেরা ইন্তেজার করো বেটা, আমিই তোমাদের মাজারে নিয়ে যাবো। অবশেষে চায়ের দাম পরিশোধ করে তিনি ধীরে সুস্থে উঠে আমাদের নিয়ে চললেন মাজার অভিমুখে। লাঠি ভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জানতে চাইলেন আমার নাম। বললাম, সুলতান। তিনি শুধরে দিয়ে বললেন, খালি সুলতান নেহী, মুহাম্মদ সুলতান বলো বেটা। তারপর নামের সাথে মোহাম্মদ যুক্ত করলে আখেরাতে যে বিশেষ ফজিলত পাওয়া যাবে তা তিনি বয়ান করতে শুরু করেন। আমি পরকালে প্রাপ্তির আশায় ইহকালে প্রতিবাদ করা থেকে বিরত থাকি। ততক্ষণে গলি পথ ধরে আমরা সম্রাটের সমাধির দেওড়িতে এসে পৌঁচেছি। কাজরির মাজহাবি শিক্ষার অচিরে ব্যবস্থা করার শেষ নসিহৎ দিয়ে বৃদ্ধ বিদায় নেন।

দিল্লীর বাদশাহের সমাধি এমনই সাদামাটা যে তা প্রথম দর্শনে ফকির দরবেশের মাজার বলেই ভ্রম হয়। আঙ্গিনায় হযরত শাহ জালালের দরগার মতো বাকবাকুম করছে অজস্র কবুতর। একপাশে নামাজ ও এবাদতের স্থান। অপরপাশে মাকবারায় প্রবেশের সিঁড়ি। নিচের দেয়ালে ঝুলানো শেষ মোঘলের মস্ত তৈলচিত্র। মাথায় ঈষৎ জটা, মস্তান গোছের এক ব্যক্তি নিজেকে খাদেম বলে পরিচয় দিয়ে আমাদের শাহী কবরটির সব কিছু বিস্তারিত বর্ণনা করে দেখাতে চান। সাথে সাথে তিনি সাফসাফ জানান, এ খেদমতের পরিবর্তে তিনি পয়সাকড়ি কিছু প্রত্যাশা করেন না। হলেণ ও কাজরি ততক্ষণে কবুতরকে দানা খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তাই আমি খাদেমের সাথে কবর দেখতে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামি। খাদেম আরো জানান, ঠিক এই জায়গাতেই বাহাদুর শাহ অনেক বৎসর নজরবন্দী ছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর পরলোক গমনের সংবাদ প্রচার না করে রেংগুনের ইংরেজ প্রশাসক কোন রূপ আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই বন্দী গৃহের আঙ্গিনায় তাঁকে দাফন করে। ইংরেজ আমলে কবরটি কখনো চিহ্নিত করা হয়নি বলে তা একশত বৎসরের উপর লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। কিন্তু রেংগুনের স্থানীয় বাসিন্দারা বংশ পরম্পরায় কিসসা কিংবদন্তী অনুযায়ী ঠিক জানতো কোথায় দিল্লীর সম্রাটের কবর। অবশেষে বছর পনেরো আগে এখানকার ভারতীয় সম্প্রদায়ের উদ্যোগে জংগলাকীর্ণ বাদশাহী হাজতখানাতে খোড়াখুড়ি পয়পরিষ্কার করে সম্রাট ও তাঁর নিকট আত্মীয়ের গোর কটি বাঁধাই করে মাজারটি নির্মাণ করা হয়। সংস্কারের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করেন যুগ্মভাবে রেংগুনের হিন্দু মুসলমান ভারতীয় সম্প্রদায়। উদ্ধোধনের দিন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতও আসেন আনুষ্ঠানিকভাবে ফিতা কাটতে।

খাদিমের সাথে আমি কবর কয়টির সামনে নীরবে দাঁড়াই। মোট তিনটি সিমেন্ট বাঁধানো কবর অত্যন্ত সাদামাটা গিলাফে আচ্ছাদিত। খাদিম মৃদু স্বরে জানান, বাহাদুর শাহ ছাড়া বাকী দুটি কবরের একটি তাঁর নাতনি রওনক জামানী বেগম ও অন্যটি তাঁর মহীষীর। ঠিক বুঝতে পারি না- এ কবরটি বেগম জিনাত মহলের কি না? কবরগুলোর পশ্চাতে দেয়ালে ইংরেজীতে লেখা রেড ফোটর্ অর্থাৎ লাল কেল্লা। সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে ওঠার পথে খাদেম আরো জানান যে, এগুলো নিশানা বা নকল কবর, আসল কবরগুলো নিচের তলায়। কথায় বার্তায় বুঝতে পারি এখানেও মোঘল স্থাপত্যের কায়দা অনুসরণ করা হয়েছে। তাজমহলে যেমন নিশানা বা নকল কবরের অনেক নিচে ভূগর্ভে সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজ বেগমের আসল গোর। অতঃপর ফাতেহা পড়তে নিচের আসল কবরটির পাশে এসে দাঁড়াই। ততক্ষণে হলেণ ও কাজরি কবুতরকে দানা খাইয়ে নীরবে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

আসল কবরটির দেয়ালে শেষ সম্রাটের আরেকটি বর্ণাঢ্য তসবির। খানিক দাঁড়িয়ে থেকে মনে হয়- বাহাদুর শাহ যেন নির্লিপ্তভাবে তাকিয়ে আছেন তাঁর গোলাপি গেলাফ ঘেরা সাদামাটা গোরের দিকে। আমরা মৌন হয়ে আরো খানিক সময় দাঁড়িয়ে থাকি। সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার সময় মনে পড়ে অনেককাল আগে এক মাইফেলে শোনা সম্রাটের রচিত উর্দূ গজলের চরণ, কেতনা হায় বদনসিব জাফর/ দাফনকে লিয়ে দুগজ জমিন বি না মিলে।

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology