ইউনাইটেড কিংডম

লন্ডনের গল্প

প্রকাশ : 17 সেপ্টেম্বর 2014, বুধবার, সময় : 20:51, পঠিত 2332 বার

মো: শফিকুল আলম বুলবুল
ছোট বেলায় বিলাতের  অনেক গল্প শুনেছি এবং বইয়ে পড়েছি। বিলাত সবার কাছে স্বপ্নের রাজ্যে । আজ সেই বিলাতের টাওয়ার ব্রিজের ওপর  আমি  দাঁড়িয়ে আছি। ব্রিজের ওপর থেকে আমি আমার বাবার সাথে ফোনে কথা বললাম । আমার বাবা ভ্রমন পিপাসু লোক । বাংলাদেশের এমন কোন উপজেলা কিংবা দর্শণীয় স্থান নেই যেখানে তিনি সফর করেন নাই। বাবার অনেক স্বপ্ন দেশ বিদেশ দেখার ।  তাই আমার বাবা ভ্রমনের গল্প খুব ভালো বাসে। বাবা আমাকে বললো সত্যিই তুমি লন্ডন ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে আমার সাথে কথা বলছো । যেন বাবা বিশ্বাস করতে পারছে না তার সন্তান সত্যিই সাত সমুদ্র তের নদি পার হয়ে বিলাতে পৌঁছে গেছে। আমি তাকে রাতে ট্রেমস নদির দৃশ্যর বর্ণনা করলাম এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভবনের কথা বললাম । ব্রিজের বিবরণ দিলাম । গ্রীনিচ বেলের কথা বললাম। রাতের ট্রেমস নদির দৃশ্য এ যেন এক স্বপ্ন ।  এই সেই ট্রেমস নদি যেখানে আমাদের সনেট কবি মাইকেল মধুসদন দত্ত ইংরেজি কবিতা লেখে ইংরেজ কবি হতে চেয়েছিলেন। কিন্ত পরে মায়ের ভালোবাসায় নাড়ির টানে কপোতাক্ষ নদির তীরে বসে মাতৃভাষায় বাংলায় কবিতা লেখেছিলেন কপোতাক্ষ নদ।  আমার ক্লাসের  শিক্ষার্থীরা বলেছে লন্ডনের গল্প শুনাতে  হবে । তাই চেস্টা করেছি ভাল করে লন্ডন শহর সহ বেশ কয়েকটি শহর দেখতে । আজ মনে পড়ছে  আমার বাবার সেই পুরাতন রেডিও কথা । তিনি বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠান শুনতেন। মাঝে মাঝে স্পষ্ট কথা শুনা না গেলেও অনেক চেষ্টা করতেন বিবিসি লন্ডনের বাংলা সংবাদ শুনার জন্য ।  এটা অনেক দিনের আগের কথা অথচ আজকাল লন্ডনের খবর জানা অতি সহজ হয়ে গেছে। দেশের যে কোন সংবাদ জানার জন্য মানুষ বিবিসির সংবাদ শুনতেন । আর এখন যে কোন মুহুর্তেই যে কোন সংবাদ মানুষ নিমিষেই পেয়ে যাচ্ছে। আমি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় বিবিসিতে চিঠি লিখেছিলাম। এবং একদিন আমার নাম সহ প্রশ্ন পড়ে শোনানো হয়েছিল আর আমার নাম প্রচার হওয়ার যে আনন্দ আমি পেয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা তখন তেমন ছিল না।  অথচ আজ সেই লন্ডনের বিবিসির সামনে আমি দাঁড়িয়ে। রাস্তায় আলোর ঝলকানি হাঁটতে ভালো লাগছিল। হেঁটে হেঁটে ব্রিজ পার হয়ে অনেক কিছু দেখলাম ।  জেকি রোজ আর আ্যান উইলিকনস আমাদেরকে স্কটল্যান্ডের আ্যাবাডেনরে ডাইস বিমান বন্দরে বিদায় দিয়ে চলে গেল আমি দুর থেকে জেকিকে দেখলাম চোখের পানি মুছছে। ভোর ৫.৩০টা ডাইস বিমান বন্দরে পৌছে সকল আনূষ্ঠানিকতা সেরে বিমানে চড়লাম বিলাতে যাওয়ার জন্য। আমি যখন ঢাকা থেকে লন্ডনে যাচ্ছিলাম তখন আমার পাশের সিটে মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি ছিল। সে আমার পরিচয় জেনে এবং ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে আমরা যুক্তরাজ্যে সফরে যাচ্ছি জেনে লন্ডন সহ আরো কয়েকটি শহরের বর্ণনা দিল এবং সে আমাদেরকে বিভিন্ন শহর ঘুরে দেখাবে বললো । তার প্রস্তাব পেয়ে ভালো লাগলো কিন্তু সময়ের অভাবে তা আর হলো না।  গল্পের ফাঁকে জানতে পারলাম সে লন্ডনে লেখাপড়া করে এবং দেশে বেড়াতে এসেছিল । তার কাছ থেকে লন্ডনের অনেক গল্প শুনলাম । সাধারণ আইন কানুন জানিয়ে দিল । আসলে যৃক্তরাজ্যের লোকজন  আইন কানুন খুবই মেনে চলে আমাদের দেশের মত নয়।  রাস্তায় কোন কিছু ফেলবে না , গাড়ীতে বসে সিট বেল্ট বাধবে , যত সময় লাগুক লাইনে দাড়িয়ে থাকবে , আমি, স্কটল্যান্ডের এক হোটেলে খেতে যেয়ে এক ঘন্টা দাড়িয়ে ছিলাম সিটে বসার জন্য। আবহাওয়া তেমন ভালো নয় প্রচন্ড ঠান্ডা আর বরফ পড়ছে। বাহিরে মাইনেস ৮ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রা ।  আমরা গরমের দেশের লোক হওয়ায় ঠান্ডা বেশ বিরুক্ত কর মনে হচ্ছিল আর লন্ডনের লোকদের কাছে এ স্বাভাবিক ব্যাপার। স্কটল্যান্ডের স্কুলের কার্যক্রমে অংশ নিয়ে এবং ট্রেনিং শেষে ইংলান্ডের রাজধানী লন্ডনে এসেছি বেড়াতে। লন্ডনের হিথ্রো বিমান বন্দরের বাহিরে বরফ পড়ছে । প্রচড ঠান্ডা পড়েছে আমার যে কয়টা শীতের কাপড় ছিল মোটামুটি তা পড়া হয়েছে শীতের হাত থেকে রক্ষা পেতে। জেকি রোজ স্কটল্যান্ডে অবস্থাকালীন মেঘ ছোঁয়াতে পাহাড়ে নিয়ে গিয়াছিলেন। এটা আরেক অভিজ্ঞতা। পাহাড়ে গিয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে নামতে যেয়ে দেখি আমার পা কমপক্ষে একফুট বরফের নিচে চলে গেছে । প্রচন্ড ঠান্ডায় আমার অবস্থা কাহিল হয়ে যাওয়ার মতো তবুও হাতটা ওপরে উঠালাম আর মেঘের সাথে হাত লেগে ঝড়ঝড় করে বরফের খন্ড পড়তে লাগলো।  ভাবলাম এত ঠান্ডায় এখানকার লোকেরা বাস করে কেমন করে । হিটারের মাধ্যমে ঘরে তাপমাত্রা ঠিক রেখেছে ওরা। ঘরে গায়ে হালকা কাপড় পড়ে থাকলেও তেমন অসুবিধা নেই । তবে বাহিরের ব্যাপারটা আলাদা। আমাদেরকে নেওয়ার জন্য বগুড়া জেলা শিক্ষা অফিসে কর্মরত গবেষনা কর্মকর্তা ফাজানা শারমিন আপার এক আত্বীয় আসছে । কথাটা শুনে ভালো লাগলো এ কারণে যে লন্ডন দেখতে ভালো জানা শোনা লোক  থাকলে ভালো হবে।  আমরা তার সাথে বাসায় গেলাম দুপুরের খাওয়া সেরে আনন্দের সাথে  বেড়িয়ে পড়লাম লন্ডন শহর দেখার জন্য । তিনি প্রথম দিন বাসে এবং পরের দিন পাতাল রেলে করে লন্ডন শহর সহ কয়েকটি শহর ঘুরে দেখালেন। লন্ডন ব্রিজ , বিবিসি লন্ডন অফিস, রানির বাস ভবন , চিনা শহর , লন্ডনের সংসদ ভবন ইত্যাদি দেখা হলো।  লন্ডন ব্রিজে দাড়িয়ে মনে পড়লো আমাদের করতোয়া ব্রিজের কথা । ট্রেমস নদির ওপর লন্ডন ব্রিজ আর করতোয়া নদির ওপর করতোয়া ব্রিজ। দুটো ব্রিজের পার্থক্য থাকলেও করতোয়া ব্রিজের যথেষ্ঠ অবদান রয়েছে বগুড়া শহরের জন্য ।  দুটা ব্রিজ  শহরের সংযোগ রক্ষা করে চলেছে।  টিকিট কেটে সারা দিনের জন্য বের হলাম । ঐ টিকিট দ্বারা সারা দিন রেল এবং সরকারি বাসে যাতায়াত করা যায় । টিকিট যন্ত্রের ভিতর ঢুকে দিলে রাতা ট্রেনে চড়ার রাস্তার ব্যারিকেট খুলে যায় এবং তখন যাওয়ার অনুমতি পাওয়া গেল। পাতাল টে্েরনর   অনেক গল্প শুনেছি আর আজ সেই ট্রেনে চড়তে মাটির নিচে নামছি । মনে ভয় আর শংকা যদি কিছু হয়।  আরিফ ভাই , সাজেদ বলেই বসলো বুলবুল ভাই নিচে নামা কি ঠিক হচ্ছে। আর জিল্লাুর ভাই আমার মত খুব খুশি। আমি তাদেরকে নিচে নামতে বলে আগে আগে চললাম। ঠিক সময়ে ট্রেন আসলো পাচঁ মিনিট পর পর ট্রেন এবং অল্প সময়ে নামতে ও উঠতে হয়। ট্রেনে উঠলাম। খুব মজা তেমন ভির নেই। আমরা সবাই এক বগিতে বসলাম। ভিতরে অন্ধকার তবে অনকে সময় বিভিন্ন শহর আসলে বাহিরে আলো দেখা যায়। আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো লন্ডন ব্রিজ দেখানোর জন্য । যখন লন্ডন ব্রিজে পৌঁছেছিলাম তখন সন্ধ্যা ৭টা  । লন্ডন ব্রিজে দাড়িয়ে থেকে রাতের লন্ডন দেখলাম খুব ভালো লাগলো । গ্রীনিচ বিল্ডিং এর নিচে পৌছে আমরা গ্রীনিচ ঘন্টার বেল ঢং ঢং করে  বেজে উঠার শব্দ শুনলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহত নৌজাহাজ দেখলাম। ট্রেমস নদিতে রেখে দেওয়া হয়েছে।  দিনের এবং রাতের লন্ডন শহর দেখে বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম।  পরের দিন আবারো সকাল নয়টায় বেড়িয়ে পড়লাম। সেই পাতাল ট্রেনে চড়ে প্রথমে আমরা গেলাম মাদার টুসো মিউজিয়ামে । প্রচন্ড ভিড়ে টিকিট ক্রয় করে ভিতরে ঢুকলাম। প্রথমে দেখা পেলাম বিজ্ঞানী হকিংসকে। অবিকল ছবি যেন জীবন্ত । আমি তার সাথে ছবি উঠলাম। মমের দ্বারা ছবিগুলো অবিকল নকল করা হয়েছে। দেখে বুঝার উপায় নেই কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা। এখানে ভারতীয় অভিনেতাদের ছবি সাজানো রয়েছে , ইন্দরা গান্ধী, গান্ধীজির ছবি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের ছবি । মার্কিন রাট্রপতি ওবামার সাথে ছবি তুললাম । ওখানে আলোকচিত্র গ্রাহকরা ছবি তুলে দিছে। এর পর নেতাজি গান্ধি , ইন্ধারা গান্ধী , বেনজির ভূঠ্রা , সাদ্দাম, হিটলার, চালস ডায়নার সাথে ছবি তুলে সামনে এগিয়ে যেয়ে দেখি ইংলান্ডের ঐতিহ্যর ইতিহাস প্রকাশ করা হয়েছে। ছোট ছোট ট্রলিতে করে তিনজন উঠতে পারে এমন ট্রলিতে করে দেখলাম। তবে এখানে ছবি তুলতে নিষেধ থাকায় আমি ছবি তুলতে পারলাম না। লন্ডন শহরটা পুরাতন শহর । ঘুরলাম বেশ কয়েকটি শহর । লন্ডনের গ্রাম দেখার জন্য গ্রামে যেয়ে দেখলাম সবুজ ঘাসের মাঠ আর পাথরের সংমিশ্রনে  মাটি  । আমাদের দেশের মাটিকে সোনা বলার কারন এদেশের মাটিতে যে কোন ফসল ফলানো যায় সহজেই। চাষ করা যায় সহজেই । আমি স্কটল্যান্ডের কৃষি ও কৃষক নিয়ে একটা লেখা লেখবো বলে মনে করেছি। আমাদের দেশের উত্তরা, বাবিধারা, গুলশান কিন্তু কম নয় । আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুতুলের দোকানে । খুবই দাম সেখানে । যাদুঘর থেকে বের হয়েই দেখলাম রিক্সা নিয়ে দাড়িয়ে আছে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম সে কোন দেশী ? সে বললো বাংলাদেশী এবং সিলেট থেকে এসেছে। লন্ডন শহরে হাটলাম । একটা পার্কে গিয়াছিলাম সেখানে অনেক লোকের সমারোহ। বসে আছে কেহ দৌড়াইতেছে । আর কয়েকজন পুলিশ তাদের ঘোড়া নিয়ে টহল দিচ্ছে । আমি ওদের সাথে একটা ছবি তুলে রাণির বাড়ী দেখতে গেলাম। বিশ্বের অনেক দেশ থেকে এসেছে লোকজন রানির বাড়ী দেখতে ।  আর মনে মনে ভাবলাম সংগীদের সাথে আরোচনা করলাম এরা এখান থেকে আমাদেরকে এক সময় শাসন করেছে। লন্ডনের লাইব্রেবী দেখলাম । একটা শপিং মলে যাওয়ার সময় দেখলাম গান গেয়ে ভিক্ষা করছে । আবার কেহ কেহ বাঁশি বাজিয়ে ভিক্ষা করছে। লন্ডনের ভিক্ষুক আর আমাদের ভিক্ষুকের মধ্যে তফাৎ হচ্ছে ওরা কাজ করে ভিক্ষা করছে আর আমাদের ভিক্ষুকরা আরাম আয়াসে ভিক্ষা করছে। ইংল্যান্ডের রানির বাসার সামনে দেখলাম একটা মুর্তির নিচে পানির মধ্যে অনেকে টাকা ফেলছে। শুনলাম ওখানে টাকা ফেলা হলে  এবং ভাগ্য ভালো হলে অনেক সুবিধা চলে আসে নিচের অজান্তে। লন্ডনের সিনেমা হলে হ্যারি পটার সিনেমা চলছে। খুবই ভিড় এবং অনেক সময় লাগবে তাই সিনেমা আর দেখা হলো না।  তাছাড়া লন্ডনের টাওয়ার বি ্রজে রাতে দাড়িয়ে থাকা বেশ আরাম দায়ক। লন্ডন শহরের দেখার মত প্রায় সব কিছু দেখতে না পারলেও অনেক কিছু দেখা হলো। বিকালে বাসায় ফিরে সন্ধ্যায় হিথ্রো বিমান বন্দরে উপস্থিত হলাম। নিদিষ্ট সময়ে  রাত ৮.৩০ মিনিটে বিমান আকাশে উঠলো বাংলাদেশের উদ্দেশ্য । পরের দিন বিকালে বাংলাদেশে পৌছে প্রচন্ড গরমে পড়ে গেলাম। ধন্যবাদ ব্রিটিশ কাউন্সিলকে যুক্তরাজ্যে ভ্রমনের সুযোগ দেয়ার জন্য ।

মো: শফিকুল আলম বুলবুল
সহকারি শিক্ষক , বগুড়া জিলা স্কুল। 
shafiqul.alambulbul@yahoo.com

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology