মাদারীপুর

বানর কুলের অভয়াশ্রমে

প্রকাশ : 13 অক্টোবর 2014, সোমবার, সময় : 08:44, পঠিত 2265 বার

নৃপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রাকৃতিক সম্পদ গাছপালা, পশুপাখি তথা জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল আমাদের জীবন ও জীবিকা , সেই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজম্মের বেঁচে থাকার নিশ্চিত করতে জীব সংরক্ষন করা প্রয়োজন । মাদারীপুরের ঐতিহ্য চরমুগরিয়া বানর আজ বিলুপ্তির পথে । এক সময় সুন্দরবন থেকে বাকেরগঞ্জ হয়ে বানরের অবাধ গতি বিধি ছিল মাদারীপুর । আজ আর সেই সুযোগ নেই । যখন বরিশাল জেলার মহকুমাররুপে ১৮৫৪ সালে মাদারীপুরের আত্মপ্রকাশ ঘটে তখনই কুলপদ্দি , চরমুগরিয়া, এবং মাদারীপুরেরবন জঙ্গল পরিস্কার করে নগর নির্মানের কাজ শুরু হয় । বন জঙ্গলভরা মাদারীপুর এবং কুলপদ্দির বানর কিছুটা জঙ্গলে পরি পূর্ণ চরমুগরিয়া বন্দরে আশ্রয় গ্রহন করে,এর ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও আছে । চরমুগরিয় বন্দর ছিল তখনকার সময়ে বিখ্যাত পাটের বন্দর বহু মারোয়ারী সম্প্রদায়ের লোকেরা স্থায়ীভাবে বসবাস করে পাটের ব্যবসা সহ অন্যান্য ব্যবসা করতেন । তারা কেউ কেউ বানরকে অতিরিক্ত ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন , এমন কি পূজাও করতে । প্রতিদিন দুবেলা নিয়মিত কাদি কাদি কলা, নানা ফলমূল, মোয়া,মুড়ি, মুড়কি, চিড়াঁ,বানরদেও খাওয়াতেন দেবতা জ্ঞানে ।নিরাপদ আশ্রয় , খাদ্যের অভাব না থাকায় ধীরে ধীরে চরমুগরিয়া বন্দর হয়ে ওঠে অভয়াশ্রম । দ্বিতিয় বিশ্বযুদ্ধকালে খাদ্যাভাবে বানরের জম্মবিরতি শুরু হয় । ১৯৪৭ সালে দেশান্তরিত হয় হিন্দরা ও মারোয়াড়িরা । ফলে বানরের খাদ্যাভাব হয় তীবতর । সে সময় দরিদ্রজণেরা বন-জঙ্গল করতো জীবিকা অর্জনে । ফলে বন্য ফলফলাদির অভাব ঘটে, খাদ্যভাব কম হয় বানরের । আহার-বাসস্থানের অভাবে প্রয়োজন ক্ষমতা হ্রস পায় এবং সংখ্যালঘু হয় বানর প্রজাতির। বর্তমানে চরমুগরিয়ার বানরকুল যেভাবে রয়েছে সবচেয়ে বেশি বানর দেখা যেত এই চরমুগরিয়া বন্দরে । পঞ্চাশ ওষটের দশকে ভারতের নদীয়া ও শান্তিপুর থেকে পর্যান্ত পরিমান বানর আসতো এ বন্দর এলাকায় । এ সময় কিছু হনুমান ওদেখা যেত । এখানে মস্তফাপুর পর্বত বাগানে হনুমান দেখা যায় । শুধু জীবজন্তুই নয়, পরিবেশের ভারসম্য রক্ষাকারী বহু প্রজাতির হাজার হাজার পাখি বিচরন ক্ষেএ ছিল এ অঞ্চল। শৌখিন শিকারিদের কোপানলের কারনে আর অতিথি পাখি দেখা যায় না শিকারিদের বুলেটের শব্দে অনেক আগেই থেমে গেছে পাখিদেও কলরব । প্রকৃতি ও ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছে এ দেড় সহস্রধিক বানর । মানুষের অভাবের কারনে উজাড় হয়ে গেছে এ অঞ্চলের ফলদ বৃক্ষ । ফলে চরম খাদ্যাভাবে পড়েছে এ বানরকুল । চরমুগরিয়া বন্দরে কি পরিমান বানর রয়েছে তার সঠিক হিসাব নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও মাদারীপুর বন অধিদপ্তর ওপশু সম্পদ বিভাগের মতে চমুরগরিয়া বন্দরে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০-এর মতো । এরা চরমুগরিয়ার ৬টি ভাগে বিভক্ত হয়ে বসবাস করে ।এ স্থানগুলো হলো লুইসভাকাস, কালীবাড়ী জেটিসি থানা বা ফাড়িঁ জেমস একাডেমি ও জম্মাদার মিল এলাকা । চরমুগরিয়ার বসবাসরত মানুষের মতে, বানরের সংখ্যা আরো বেশি হবে । বানরগুলো কালীবাড়ী,স্বর্নকারপট্ট্রিতে এর অংশ চৌরাস্তা, নদীর পাড়ে এক অংশ এবং জেটিসি ওআদমজীতে আরেক অংশ থাকে । এক অংশের বানর অন্য অংশের এলাকায় প্রবেশ করে না ভুলক্রমে যদি কেউ প্রবেশ করেই ফেলে তা হলে যুদ্ধ বা ঝগড়া অনিবার্য । কালীবাড়ী স্বর্নকারপট্টিতে বানরগুলো আবাসিক এলাকায় বাড়ির চলার নিচে ওগুদামে রাতে থাকে । এবং নদীর পাড়, চৌরাস্তার বানরগুলো জেমস একাডেমি ও আরো ২টি পরিত্যক্ত পাট গুদামে রাত যাপন করে । ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে এদের সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়তে হয় । তখন একটু আশ্রয়ের জন্য এদের দিগিদিক ছুটতে হয় । মাদারীপুর জেলা শহর থেকে ৩ কিলোমিটার উওরে চরমুগরিয়া বন্দরে অবস্থান । আড়িয়াল খাঁ ওকুমার নদী পরিবেষ্টিত এলাকা । বানরদেও মধ্যে আছে দলাদলি । প্রধান ৩টি বিভক্তির মধ্যে আরো রয়েছে ৬-৭টি বিভক্ত দল । দলে দলে কোন্দাল লেগে যায় মাঝে মধ্যে । এদের চিৎকার-চেচাঁমেচি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এলাকার মানুষ তখন বেশি বিব্রত, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে । ক্ষুধার তাড়নায় এসব বানর মানুষের বাড়িতে চলে আসে । ক্ষুধার তাড়নায় ইতিমধ্যে অনেক বানর মাদারীপুর শহরে ধাবিত হয়েছে । রেস্টুরেন্ট ও হোটেল ব্যবসায়ীরা এবং ফল বিক্রেতারা মাঝে মধ্যে এদেও বিভিন্ন খাদ্য দিয়ে বাচিঁয়ে রাখে । ১৯৮৮ ও১৯৯৮সালের বন্যায় এখানকার বানরকুল বিপন্ন হয়ে পড়ে । তখন এখানকার বেশ কিছু বানর মারা যায় । ক্ষুধার তাড়নায় শীর্নকায় বনরগুলো বেচেঁ আছে কিছু মানুষের দানে । ২০০৩সাল থেকে প্রতি শুক্রবার এক দিন ফ্রেন্ডস অব ন্যাচার নামে এক সংগঠন নিয়মিতভাবে বানদের খাদ্য বিতরন করে আসছে তারই পাশাপাশি ২০০৬ সালের ফের্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত জেসিডিপি নামে একটি বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী মজিবুল হক দুলু প্রতিদিন ৫০০টাকার খাদ্য বানরের জন্য বিতরন করেন । কিন্তু মানুষ খেতে পায় না বানরকে খাওয়ার এ দরনের বিরূপ মন্তব্যের কারনে ও স্থানীয় লোকের হস্তক্ষেপের কারনে তিনি তা বধ করে দেন ।২০০৬সালে বন বিভাগ থেকে ১ কোটি টাকা টেন্ডার আহব্বান করা হয় । তার মধ্যে প্রতিদিন বানরকে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করে খাদ্য বিতরনের এবং বানরের থাকার জন্য স্থায়ী শেড নির্মান ও বিভিন্ন প্রকারের ফলফলাদিও গাছ লাগানোর জন্য । বানর সংরক্ষন করা উচিত এ কথা আজ মাদারীপুরবাসীসহ সবারই দাবী । সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষন করা গেলে তাদেও রক্ষা করা সম্ভব পরিবেশবদী সংগঠন ফ্রেন্ডস অব ন্যাচারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রাজন মাহমুদ বলেন,চরমুগরিয়া বন্দরের ওপারে কুমার নদীর পশ্চিম দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিত্যক্ত ১৩৩একর জায়গা ভূমিদস্যুদের দখলে পড়ে আছে । ওই জমিগুলো উদ্ধার করে একটি অভয়ারন্য তৈরি করলে শুধু বানরকুল নয়, এ এলাকার হারিয়ে যাওয়া বিলুপ্তপ্রাপ্ত সব বন্যপ্রানী সংরক্ষিত হবে । রক্ষা পাবে আমাদের জীববৈচিত্র।



নৃপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
কবি/মুক্ত ফিচারলেখক/ পুরাকীর্তি গবেষক
খালিয়া, রাজৈর, মাদারীপুর
মোবাইল : ০১৭১৬-৭১৫৫৬০


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology