বরিশাল

বরিশালে চারণ কবি মুকুন্দ দাসের কালী বাড়ী

প্রকাশ : 28 অক্টোবর 2014, মঙ্গলবার, সময় : 10:54, পঠিত 3226 বার

নৃপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
ভয় কি মরনে /রাখিতে সন্তানে / মাতুঙ্গি মেতেছে আজ / সমরো রঙ্গে- ব্রিটিশবিরোধী জাগানিয়া এমন সব গনসংগীত আজও প্রান ছুঁয়ে যায় মুক্তচিন্তার মানুষের । আজও প্রান জাগায় সমাজবদলের কিংবা সত্য- ন্যায়ের পথে দেশগড়ায় ব্রত মানুষের । চারনকবি মুকুন্দ দাস এমন অনেক গান বানিয়ে , গান শুনিয়ে যেমন আন্দোলিত করেছিলেন স্বদেশিদের ,বিল্ববের ঝান্ডায় রসদ জুগিয়েছিলেন , কবিতা , নাটক , যাএাপালায় , বিট্টিশবিরোধী বিপবীদের রাজনৈতিক মঞ্চে সমানে অংশ নিয়েছিলেন , তেমনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ও বিখ্যাত হয়ে ওঠেন । উপমহাদেশজুড়ে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে গত শতাব্দীর প্রথমভাগ থেকেই । আজ চরনকবি মুকুন্দ দাসের ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী । ১৯৩৪ সালের ১৮ মে গভির রাতে ঘুমের মধ্যে মারা যান তিনি । তাঁর পূর্বপুরুষেরা ঢাকার বিক্রমপুরের মানুষ হলেও তিনি শৈশব থেকেই বেড়ে ওঠেন বরিশালে । তিনিও জীবদ্দশায় বরিশালের মানুষ হিসেব্ইে নিজেকে পরিচিত করেছেন স্বাচ্ছন্দে । স্কুলের পড়াশোনা তেমন হয়নি মুকুন্দ দাসের । কিছুদিন কেটেছে পাঠশালায় , তারপর বরিশালের জিলা স্কুল এবং সবশেষে বরিশাল ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা । তবে প্রায় কুড়ি বছর বয়সে কোনোরকম সার্টিফিকেট ছাড়াই পড়ালেখার ইতি টানেন তিনি । মুকুন্দ দাসের পারিবারিক নাম ছিল যজ্ঞেশর দে । বাবা গুরুদয়াল দে সরকারি অফিসের নিম্মশ্রেনীর কর্মচারীর কাজ করার পাশাপাশি  একটি মুদিদোকান চালিয়ে সংসার টেনে কিতেন কোনোভাবে । পড়ালেখায় মন ছিল না যজ্ঞেশর ওরফে মুকুন্দ দাসের । বাবা তাকে বলে  কয়ে বেঁধে দোকানদারিতে বসিয়ে দিয়েছেন । তখনআ তার সঙ্গে পরিচয় হয়  বীরেশ্বর গুপ্তের গানের দলের সঙ্গে । যুক্ত হন ওই দলের প্রধান সহায়ক হিসেবে । শুরুতে কেবল কীর্তনে বেশি ঝোঁক থাকায় সেটা চর্চায় বেশি মনোযোগী ছিলেন । কীর্তনিয়া হিসাবে নামডাক ও ছঢ়িয়ে যায় দ্রুত । কীর্তন গানের পাশাপাশি নিজে গান লিখে গাইতে শুরু করেছিলেন।  এভাবেই বেড়ে ওঠা মুকুন্দ দাসের । তখনো মুকুন্দ নাম প্রচারিত হয়নি । সবাই ডাকে যজ্ঞা । কীর্তনের আসরে ডাক পড়ে । গানের আসওে ডাক পড়ে। এর মধ্যেই ১৯০০সালে ২২ বছর বয়সে বিয়ে করেন । এর পরপরই রামানন্দ ঠাকুরের কাছে দীক্ষা গ্রহন । তিনিই তার নাম রাখেন মুকুন্দ দাস । সেই সঙ্গ নিজে ঢংয়ে গান -  কবিতা - যাএাপালার ভেতরে ঢুকে যান আরও । ১৯০৩ সালে বরিশাল আদর্শ প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই । নাম,সাধনসঙ্গীত । সেটি উৎর্সগ করেন গুরু রামানন্দকে । যোগাযোগ হয় নামীদামি স্বদেশি চেতনার সাহিত্য -সংগীত আসরে । এ সময় থেকে মহাত্মা অশ্বিনীকুমারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গুরু- শিষ্য পর্যায়ে উন্নীত হয়ে থাকে । স্বাদেশিকতার চর্চাও এখান থেকে শুর হয় এবং মুকুন্দ দাস ক্রমেই বৈষ্ণব ধারনা থেকে সরে আসতে থাকেন । ১৯০৪সালের দিকে কালিসাধক সোনাঠাকুর দ্বারা প্রভাবিত হন মুকুন্দ দাস । ১৯০৫ সালে রচনা করেন প্রথম পালাযাত্রা

মাতৃপুজা । যাএার মধ্য দিয়ে স্বদেশি আন্দোলনের ধারাকে আরও জাগরিত করেন । ওই যাএাপালার পান্ডুলিপি বাজেয়াপ্ত করে তৎকালীন পুলিশ । যাএাদল গড়ে সারা দেশ ঘুরে বেড়াতে থাকেন তিনি । যাএা থামিয়ে মাঝেমধ্যেই বক্তাতার ঢঙ্গে সমকালকে তুলে ধরেন । মুকুন্দ দাসের যাত্রাপালা ও গান বিট্টিশ শাসকের ভীতির কারন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন । বিট্টিশ সরকারের রোষানলে পড়ে ১৯০৮ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন । জেল খেটে ১৯১১ সালের প্রথমভাগে দিলি কারাগার থেকে ছাড়া পান । এর মাঝেই স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে । জেলফেরত মুকুন্দ আবার পৈতৃক মুদিদোকানের হাল ধরেন । কিন্তু অল্প ব্যবধানে আবার তিনি বেড়িয়ে পড়েন গান , যাএাপালা নিয়ে মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে বিপবীর বেশে । ভারতবর্ষের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়ে তার নাম । দেশবন্দু চিওরঞ্জন দাস , প্রিয়ম্বদা দাস , স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় , আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর গানে মুগ্ধ । নজরুল এসে দেখা করেন তাঁর সঙ্গে । এসবের মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তিনি বরিশালের কাশীপুর কালীমন্দিরের জায়গা কেনেন , যা এখন বরিশাল নগরীতে ঢোকার মুখে নথুলাবাদ বাস টার্মিনাল -সংলগ্ন চারনকবি মুকুন্দ দাসের কালীবাড়ি । জায়গা ছিল ৮৭ শতাংশ , এখন আছে মাএ ১৯ শতাংশ । বাকিটা বেহাত হয়ে গেছে । বর্তমান স্থানটুকু ঘিরে আছে ছাএাবাস , লাইব্রেরি, দাতব্য চিকিৎসালয় এবং পুজামন্দির । সামনের কিছু অংশে আছে একসারি স্টল । একটি কমিটির মাধ্যমে চলছে এর সার্বিব ব্যবথাপনা । মুকুন্দ দাসের স্মৃতিরক্ষায় এখন বরিশালে সবেধন নীলমনি হয়ে আছে ওইটুকুই এ ছাড়া তাঁর গান এবং সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বিছিন্ন ভাবে কিছু কাজ হচ্ছে বরিশাল ও ঢাকায় । কেউ কেউ তাকে নিয়ে গবেষনার কাজে ওহাত দিয়েছেন । কয়েক বছর মুকুন্দ মেলা হলেও এখন পুরোপুরি বন্ধ । উদীচী-বরিশাল থিয়েটারের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় ১৯৮৬সালে প্রকাশ করেছিল মুকুন্দ দাসের গানের একটি ক্যাসেট । মুকুন্দ দাস বিষয়ে বইও দুষ্প্রাপ্য । যা পাওয়া যায় , সেগুলো গতানুগতিক । এ ছাড়া গত বছর থেকে দেশের অন্যতম খ্যাতিমান নাট্যসংগঠনপ্রাঙ্গনে মোর মুকুন্দ দাসকে নিয়ে বেশ সমৃদ্ধ একটি নাটক তৈরি করেছে , যা এখন বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনীর সময় বেশ প্রশংসিত হচ্ছে । এ ছাড়া অনেক দিন আগে বরিশাল নাটক মুকুন্দ দাসের যাত্রাপালা সমাজ নিয়ে কাজ করেও বেশ সাফল্য পায় । বরিশালের অন্যতম নাটকের দল খেয়ালি গ্রুপ থিয়েটার প্রতি বছরই মুকুন্দ দাসের স্মরনসভা করে থাকে । পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বরিশালের বেশ কয়েকজন লোক,সংঙ্গীতশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব যাঁর যাঁর অবস্থানমতো কেউ মুকুন্দ দাসকে নিয়ে লেখালেখি করেন , কেউ কেউ গান করেন , কেউ তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা-পর্যলোচনা করে নতুন প্রজম্মের মাঝে মুকুন্দ দাসকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন । আজ মুকুন্দ দাসের মৃত্যুদিবসে আসুন কেবল মুকুন্দ দাসের বরিশালেই নয়, সারা দেশের মানুষ , সারা বিশ্বের বাঙালি এক হয়ে, এক সুরে, বহুকন্ঠেন চারনকবি মুকুন্দ দাসের ভাষায় বলে উঠি -আয়রে বাঙালি/আয় সেজে আয়/ আয় লেখে যাই/ দেশের কাজে nripen1980@gmail.com


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology