মাদারীপুর

ঐতিহ্যবাহী খালিয়া কুমার পল্লী

প্রকাশ : 28 অক্টোবর 2014, মঙ্গলবার, সময় : 11:01, পঠিত 5653 বার

নৃপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রতি দিনই চাকা ঘোরাতে হয় । চাকার এক একটি পাকে চলে সংসার। কাঠের তৈরি চাকাটি কোটিপাক ঘুরছে তাতেও তাদের ভাগ্যের চাকা মরিচা ধরা । অভাব অনটন আর দুঃখ তাদের পিছু ছাড়ে না । পেশায় তারা কুমার বা পাল । দিন দিন যে ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তাতে তারা পেশা নিয়ে বেশ চিন্তিত । প্রযুক্তির হাওয়া বদলে ঘুরিয়ে মাটির তৈরি হাড়ি ,পাতিল, বাসন  কোসনের প্রচলন দিনকে দিন হারিয়ে যাচ্ছে । তারপরও দেশে এমন এলাকা বা এমন গ্রাম আছে যেখানে এখনো বাংলার  ঐতিহ্য তারা ধরে রেখেছে । এমন কি সে গ্রাম জুড়ে একটিই পেশা আদিকাল ধরে চলে আসছে । গ্রামটি মাদারীপুর জেলার খালিয়া ইউনিয়নের কুমার পাড়া বা কুমারপল্লী। পুরানো একটি ছোট গ্রাম  । এ গ্রামে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা শতাধিকের উপরে। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কম হলেও কর্মঠ মানুষের সংখ্যা বেশি ।  গ্রামটিতে হিন্দুদের সংখ্যা  বেশি । মজার ব্যাপার গ্রামটিতে একটি পেশাই আদিকাল থেকে চলে আসছে । গ্রামের মানুষ সকাল থেকে গভীর রাত অবধি কাজ করে । গ্রামে বসবাসকারী শকয়েক লোকের মধ্যে সব বয়সী মানুষই এ পেশায় জড়িত । অর্থাৎ বসবাসকারী সব পরিবারই কুমার পেশায় নিয়োজিত পরিবার । গ্রামের সব ব্যস্ততায় সময় কাটায়কুমার পরিবারের সদস্যরা।



প্রতিটি বাড়ি তে চলে দিনভর মাটির তৈরি হাড়ি পাতিল, ঢাকনা, কলস,পুতুল,ভাশি, ডাবর, ধুপদানি, প্রদীপ, থালা, সরা, পটে আকা  লক্ষীর সরা,তাগাড়ি,জল ঘট,জলেরপট, খেলনা, কড়াই, ফুলের টব, পিঠা বানানোর সাজ, মুর্তি, প্রতিমা, চুলা,  ইত্যাদি বানানোর কাজ । এছাড়া প্রতিটি বাড়ির চেহারাও একই রকম। একই কাজের জন্য ভাড়ির আশ পাশের পরিবেশ একই ধরনের গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়বে খোলা জায়গাগুলোতেই সারিসারি মাটির তৈরির হাড়ি পাতিল সাজানো যার সংখ্যা হাজার হাজার  দেখে মনে হবে মাটির হাড়ি পাতিল আর মাটির একটি বিশাল পাহাড় । প্রায় বাড়ীতে ঢুকলে চোখে পড়বে হাড়ি আর মাটির তৈরির বাসন কোন গুলো কাচা ,অর্থাৎ পোড়ানো হয়নি আবার কোনো গুলো পুড়ে শুকিয়ে গ্রামের প্রতিদিনই কয়েকটি ট্রাক আসে এবং মাটির হাড়ি সাজানো ট্রাক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যায়। দুপুর বেলা গ্রামটিতে চলে দ্রুতগতিতে কাজ । তখন সব বাড়ী কুমাররা এক সঙ্গে কাজে নামেন । গ্রামের নারী পুরুষ সবাই মাটির তৈরির বাসন বানানোতে বেশ দক্ষ । শিশু থেকে পৌঢ় সবার এ কাজ জানা । গ্রামের পুরানো কুমার যতীন পালের সঙ্গে কথা হয়, তিনি জানান, মাটি ছ্যানা থেকে শুরু করে একদম হাড়ি বানানো পর্যন্ত সবকিছুতে সময় লাগে পাচ মিনিট এত অল্প সময়ের মধ্যে একটি হাড়ি বানানো সম্ভব । তৈরিকৃত হাড়িটি কাঠদিয়ে ঠিক করে রোদে দিতে হয় । হাড়িটি আগুনে পুড়লে পুর্নাঙ্গ একটি হাড়ি । কুমার পল্লী হিন্দু ধর্মবলম্বীদের  সংখ্যা বেশী হলেও কাজ গুলো এখন হিন্দু মুসলমান দু ধর্মের লোকেরা সমান ভাবে করছে । বিধবা ননী বালা পাল (৮২)নামে এক নারী কুমার গ্রামটিতে হাড়ি পাতিল তৈরির কাজ করছেন । তার হাত জশ আছে। তার বানানো হাড়ি পাতিলের সুনাম রয়েছে।এ পেশায় তিনি বেশ পুরানো  ননী বালা পাল (৮২ )অনেক দিন আগে তার স্বামী রমেশ পাল মারা যান , এখন বয়সের ভারে খানিকটা ন্যুজ। এই শীতে ঠিক মতো হাটাচলা করতে পারে না । বয়স ৮২ পেরিয়ে গেছে । পান না  বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতা । বেচে থাকার  কাছে  বয়সকে  হার মানিয়েছেন । জীবিকা নির্বাহে তিনি এ বয়সে প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে রাত অবধি মাটির  বাসন কোসন তৈরি করে চলছেন  । কুমার পল্লী এলাকায় বসবাসরত বৃদ্ধা মৃৎ শিল্পী বিধবা ননীবালা পালের জীবন সংগ্রামের চিত্র  এটি   । রিনা রানী নামে আরেক হিন্দু নারীকুমার গ্রামে এ পেশায় পুরানো । কুমার পল্লী গ্রামের গুরুদাস পাল (৯৫) জানান, তার দাদার দাদারা এ গ্রামে এসেছিলেন । তখন থেকে এখানে হিন্দু পাল বংশের আর্বিভাব । পালদের আনা হয় প্রতিমা, মুর্তি ,হাড়ি পাতি বানানোর কাজের তবে শুধু রাজা -জমিদারদের জন্য । কিন্তু রাজা- জমিদারদের প্রথা উঠে যাওয়ার পর কুমার পল্লী গ্রামের কুমাররা বেকার হয়ে যায় । পরে তারা নিজেরা  মাটির বাসন তৈরি করে নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে রাস্তায় ঘুরেঘুরে বিক্রি করতে শুরু করেন । এ নিয়ম চলে আসছে অনেক বছর ধরে নিখুত হাতের ছোয়ায় মাটির বাসন কোসন বানানো সম্পর্কে তিনি বলেন ছোট বেলা থেকে চেষ্টা সাধনা করলেই এমন কাজ সহজে পারা যায় । তা ছাড়া এ বংশে যারা জম্ম গ্রহন করে ঈশ্বর প্রদও ক্ষমতা তাদের মধ্যে থেকে যায় এসব তৈরিতে। এপেশায় আয় সর্ম্পকে তিনি বলেন , আয় বেশি হলে কি বাড়ির সবাই এ কাজ করত ? একটি হাড়িতে ৫ থেকে ১০টাকা লাভ হয় । সংসার চালানোর জন্য এক একটি বাড়ীেেত প্রতিদিন কমপক্ষে এক হাজারেরও বেশী মাটির তৈরি হাড়ি পাতিল বাসন কোসন বানানো হয় । কুমার পেশায় প্রধান গ্রামটিতে তরুন প্রজম্মের কাছে পড়া শোনা প্রাধান্য পেয়েছে পড়াশোনার পাশাপাশি তারা একাজটিও চালিয়ে যাচ্ছে ।  চিও পালের মেয়ে শান্তনা রানী পাল( শান্ত) জানায় পড়াশোনা না করলে ভবিষ্যতে নিজের অস্তিত্ব টিকানো যাবেনা । কারন পড়াশোনা ছাড়া কোন পেশার দাম নেই । তবে যেহেতু এটি বাপ দাদা থেকে পাওয়া পেশা সেহেতু পেশাটিও জানা জরুরী । সব নিয়ম ভেঙ্গে লেখাপড়া শিখে মানুষের মত মানুষ হতে হবে ।

লেখক মুক্ত সাংবাদিক
নৃপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
রাজৈর -মাদারীপুর


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology