বান্দরবন

মেঘের রাজ্য পাসিংপাড়া

প্রকাশ : 13 নভেম্বর 2014, বৃহস্পতিবার, সময় : 10:30, পঠিত 4463 বার

মোঃ অহিদ উল্লাহ পাটোয়ারী
এবার সব কাজ ফেলে উড়ু উড়ু মনটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে “ঘুরে বেড়াই বাংলাদেশ” দলের বন্ধুরা গিয়েছিলাম মেঘ পাহাড়ের দেশ বান্দরবানে। সেখানে মেঘ ছাপিয়ে মাথা উচু করে বসে থাকা গ্রাম পাসিংপাড়া এবং চারপাশে পাহাড় দিয়ে ঘেরা লুকানো এক অসাধারণ সুন্দর গ্রাম লুং থাউসি। রাতের বাসে রওনা দিয়ে বান্দরবানে পৌঁছায় সকাল ৯টা ১০ মিনিটে গন্তব্য বগালেক হয়ে পাসিংপাড়া। বান্দরবান থেকে জিপ গাড়িতে সোজা রুমা বাজার। রুমা থেকে গাইড পানুওম বমকে সঙ্গে নেই। আর্মি ক্যাম্পে নাম ঠিকানা এন্টি করে চান্দের গাড়িতে রওনা দেই। থিম পার্কে না গিয়েও রোলার কোষ্টারের মজা পেতে চাইলে উঠে পড়–ন বান্দরবানের চান্দের গাড়িতে। কমলা বাজার পর্যন্ত পথটা কাটল এভাবেই। বগালেকের পথে পর্যটকদের নামিয়ে দেয় কমলা বাজারে। এবার শুরু হলো বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে উচু-নিচু পাহাড় বেয়ে বেয়ে মাঝরাতে পৌঁছায় বাংলাদেশের সবচেয়ে উচুতে অবস্থিত একটি অদ্ভুত প্রাকৃতিক হৃদ (বগালেক)। বগালেকে পানির রঙ লালচে ধরনের দেশের কোনো জলাভূমির সঙ্গেই যার মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এ লেকের উচ্চতা প্রায় তিন হাজার ফুট। লেকের টলটলে পানি দেখে সাতার না জেনেও ঝাপিয়ে পড়লেন স্বপন মামা। মামাকে তুলতে গিয়ে পালিয়ে গেল “ঘুরে বেড়াই বাংলাদেশ” দলের রাতের ঘুম। মুগ্ধ নয়নে দেখলাম আকাশ পাহাড় আর জলের মিতালী। প্রকৃতি এখানে ঢেলে দিয়েছে একরাশ সবুজের ছায়া। যেন তুলির আচড়ে বগালেকের পুরো জায়গা সেজেছে ক্যানভাসের রঙে আর প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে একেছে জলছবি। পরদিন সকালে চিংড়ি ঝরনা পার হয়ে পাহাড়ি পেয়ারার লোভে ঢুকে পড়লাম বান্দরবানের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম দার্জিলিং পাড়ায়। সেখানকার দোকানদার “ঘুরে বেড়াই বাংলাদেশ” দলকে জানালেন, পাশেই নাকি একটা সুন্দর পাড়া রয়েছে নাম লুংথাউসি। গাইড পানুওম বম ভরসা দিল, সে নাকি সব চেনে। তার উপর ভরসা করেই কেওক্রাডংকে ফেলে বা দিকে নেমে চললাম পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। সে এক রোমহর্ষক যাত্রা। কোথায় যাচ্ছি কিছুই জানি না। পাহাড়ে ওঠার চেয়ে নিচে নামা হলো সবচেয়ে কঠিন কাজ। সে সময় যদি পায়ের নিচে থাকে ঝুর ঝুরে মাটি, তাহলে তো কথাই নেই। একটানা প্রায় আড়াই হাজার ফুট খাড়া পাহাড়ের ওপর থেকে নামতে থাকলাম। পরিস্থিতি এমন যে পা একটু পিছলালে সোজা পড়ব নিচে থাকা সঙ্গী রাসেল ভাইয়ের ঘাড়ে। এরপর আবার ওপরে ওঠা “ ঘুরে বেড়াই বাংলাদেশ” দলের দুঃখ দেখে আকাশও কেঁদে দিল। টানা আট ঘন্টা বৃষ্টিতে সৃষ্টি পাহাড়ি ঢল ঠেলে আর শরীরে গোটা ৬০-৭০ টি জোক নিয়ে শেষ বিকেলে যখন লুংথাউসি পাড়ার সীমানায় পা রাখলাম, তখন আর শরীরে এতটুকু শক্তিও অবশিষ্ট রাখেনি খেয়ালী সবুজ পাহাড়। রাতে থাকার জন্য দুইটা তাবু টাঙ্গানো হয়েছিল। সেগুলো ভিজে জবজবে চারপাশে তাকিয়ে দেখি পায়ের নিচে থেকে মেঘেরা কুন্ডুলী পাকিয়ে উঠে যাচ্ছে ওপারের দিকে। যেন এ মাত্র তাদের স্কুল ছুটি হলো। অদ্ভুত সেই দৃশ্য। সূর্যের আলোয় মৃহর্তেই সাদা থেকে সোনালী হয়ে যেন যেমন খুশি তেমন সাজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। এখানে সাদা কুন্ডুলী তো খাকি দূরে পাক খাচ্ছে সোনালী মেঘ। চারপাশে যেন অনেক রংধনু। একটা গুনতে শুরু করলে মৃহর্তেই সেখানে আরেকটা তৈরী হয়ে যায়, তার ওপর সিড়ির মতো আরেকটা, যে তৈরী হচ্ছে স্বর্গে যাওয়ার রঙ্গিন রাস্তা। বেলা বাড়তে বাড়তেই মেঘগুলো উঠে যায় ধরাছোয়ার বাইরে। কাজেই সেগুলোকে আবার নাগালে পেতে হলে “ঘুরে বেড়াই বাংলাদেশ” দলকে উঠতে হবে আরও ওপরে। সুতরাং আর দেরি না করে রওনা দিলাম অনেক উচু গ্রাম বা জনবসতি এলাকা মেঘের রাজ্য পাসিংপাড়ার দিকে। পাহাড়ে যান বাহন বলতে দুটি পা-ই সম্বল। সেগুলোকে বিরাম না দিয়ে সন্ধ্যার পরে পৌঁছে গেলাম মেঘের রাজ্য পাসিংপাড়ায়। ঘন মেঘে ছেয়ে আছে এই পাড়ার পুরো রাস্তা। অনেক নিচের ব্যস্ত শহর সেখানে গরমে দরদর করে ঘামছে। সেখানে “ঘুরে বেড়াই বাংলাদেশ” দল ঠান্ডায় কাপছি থরথর করে। ঘন কালো মেঘের জন্য এখানে ঘর বাড়িতো দূরের কথা, হাতে রাখা চায়ের কাপটা পর্যন্ত দেখা যায় না। মেঘগুলো পুরোপুরি কুয়াশার মতো। গায়ে লাগলে টের পাওয়া যায় জামা-মাথা ভিজে যাচ্ছে। হাত দিয়ে ধরা যায় না, দলা পাকানো যায় না, অথচ সে আছে। রাত ১০টার দিকে মন কালো ভারী মেঘে ঢেকে গেল রাস্তার প্রতি ঘাসের মাথা। শুরু হলো তান্ডবলীলা বজ্রসহ বৃষ্টি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সবই হচ্ছে “ঘুরে বেড়াই বাংলাদেশ” দলের পায়ের নিচে! পায়ের নিচে বজ্রপাত, বৃষ্টি, বাতাস সব বুঝতে পারছি কিন্তু একটা ফোটাও পায়ে এসে লাগছে না। লাগবে কিভাবে “ঘুরে বেড়াই বাংলাদেশ” দলতো এখন মেঘের ওপরে।

কিভাবে যাবেন ঃ ঢাকার ফকিরাপুল, কমলাপুর, কলাবাগান, ইস্পাহানী বিল্ডিংয়ের পাশ থেকে শ্যামলী, এস আলম, সৌদিয়া, ডলপিন ও সেন্টমার্টিনসহ আরো অনেক পরিবহনের বাসে বান্দরবান যাওয়া যায়। ভাড়া ৭৩০টাকা (নন এসি) ৮৫০ (এসি), বান্দরবান থেকে রুমা বাজার পর্যন্ত জিপে জনপ্রতি ১৫০ টাকা। রুমা থেকে বগালেক পর্যন্ত রিজার্ভ চান্দের গাড়িতে ভাড়া প্রায় আড়াই হাজার টাকা। এরপর বাকিটা হাঁটা পথ। পাসিংপাড়া পৌঁছাতে ছয়-সাত ঘন্টা লাগবে।


মোঃ অহিদ উল্লাহ পাটোয়ারী
প্রতিষ্ঠাতা “ঘুরে বেড়াই বাংলাদেশ”
মোবাইল ঃ ০১৭২-৬৬০৭৫৯০, তারিখ ঃ ০৯/১১/২০১৪ইং


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology